জিন্নাহর ছবি ঘিরে উত্তেজনা, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাল্টা গোলাম আযমের ছবি

pic-x

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিবাদে সোমবার ওই সংগ্রহশালায় গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি টাঙায় ছাত্র ফেডারেশন। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন ছাত্র জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে ছাত্রদল-সহ একাধিক ছাত্র সংগঠন। আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও।

জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। তার কিছুক্ষণ পরেই সংগ্রহশালায় ঢুকে ফ্রেম ভেঙে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন প্রাক্তন ছাত্র আবু তৈয়ব হাবিলদার। তাঁর বক্তব্য, ১৯৪৮ সালে ঢাকার কার্জন হলে এবং রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। তাঁর সেই অবস্থানের বিরুদ্ধেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। ফলে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর স্থান পাওয়া নিয়ে আপত্তি রয়েছে তাঁর।

এর পর বিকেল ৩টে নাগাদ ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল পড়ুয়া সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবির জায়গায় আশির দশকে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি টাঙিয়ে দেয়। সংগঠনের বক্তব্য, ইতিহাসকে একপেশেভাবে তুলে ধরা মেনে নেওয়া হবে না।


ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশচন্দ্র রায় সাহস অভিযোগ করেন, ডাকসু একের পর এক বিতর্কিত কাজ করছে। জিন্নাহর ছবি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরানোর দাবি জানিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, দাবি না মানলে উপাচার্যের দফতর এবং ডাকসু সংগ্রহশালায় আন্দোলনে নামবে সংগঠন।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশও জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের উপস্থাপন করে সংগ্রহশালাকে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের চর্চার জায়গা করা উচিত নয়।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি সংসদের আহ্বায়ক সৈকত আরিফের অভিযোগ, জিন্নাহর ভূমিকা বাদ দিয়ে তাঁকে নায়ক হিসেবে তুলে ধরা ইতিহাসের বিকৃতি। এ ঘটনায় ডাকসুর নেতৃত্বের ক্ষমা চাওয়া উচিত বলেও দাবি করেন তিনি। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটও মিছিল করে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ। তাঁর দাবি, জিন্নাহকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়নি; বরং বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানই তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাই উল্টে জিন্নাহর প্রতি সহানুভূতি তৈরি করছে।

এদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানানো হয়েছে। ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর উদ্যোগে অনুমোদনহীন ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ছবি ও দলিলের উপস্থাপন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিক ইতিহাস যথাযথ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হোক।

উল্লেখ্য, রবিবার ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা সংস্কার করা সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করেন। সেখানে জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়েছিল। তার মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ভাষণের ছবি এবং ১৯৪০ সালের লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনের ছবি ছিল। জিন্নাহর ছবি-সহ ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত একটি পাকিস্তানি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল।