Explainer: ঢাকা-কাঠমান্ডুর পর বেলগ্রেডেও ছাত্র-বিপ্লবে পতন ভুচিচের, ব্রাজিলে বামপন্থী লুলার প্রত্যাবর্তন: ভারতে কতটা প্রাসঙ্গিক?

Aleksandar Vucic, the Serbian leader brought down by students (Image: X/@mhdksafa)

একুশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি কি এক নজিরবিহীন পালাবদলের (Global Political Shift) সাক্ষী থাকছে? মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে ইউরোপের বলকান অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকা থেকে উঠে আসা দু’টি নির্বাচনী ফলাফল সেই প্রশ্নটিকেই আরও জোরালো করছে। একদিকে সার্বিয়ায় প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতার রাশ নিজের হাতে রাখা দক্ষিণপন্থী শাসক আলেকজান্ডার ভুচিচকে (Aleksandar Vucic) ব্যালট বক্সে ধরাশায়ী করল সে দেশের ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন (Student-led Protest Movement)। অন্যদিকে, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় দফার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে উগ্র দক্ষিণপন্থী ফ্লাভিও বোলসোনারোকে (Flavio Bolsonaro) হারিয়ে চতুর্থ বারের জন্য মসনদ দখল করলেন বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা (Luiz Inacio Lula da Silva)।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা এবং ২০২৫ সালে নেপালে কে পি শর্মা ওলির পতনের পর সার্বিয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ (Gen Z Uprising) আর কেবল রাজপথের ব্যারিকেডে সীমাবদ্ধ নেই, তা সরাসরি শাসকের গদি উল্টে দেওয়ার কারিগর হয়ে উঠেছে। আর ঠিক এই আবহেই ভারতে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ‘এসআইআর’ (Special Intensive Revision-SIR) ঘিরে তীব্র জনক্ষোভ এবং দিল্লি-মুম্বই থেকে কলকাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া প্রবল ছাত্র-যুব বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নতুন করে দানা বাঁধছে শাসন পরিবর্তনের বিতর্ক (Regime Change Debate)।<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>🇷🇸 After nearly 2 years of almost daily peaceful protests across Serbia, students have won the elections, defeating the country’s autocrat Vucic. Video by Student List who will govern the country. https://t.co/m4ngvvzEFn</p>&mdash; kos_data (@kos_data) <a href=”https://x.com/kos_data/status/2114484480404594913?ref_src=twsrc%5Etfw”>October 25, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>

যেভাবে ছাত্রদের কাছে হার মানলেন ভুচিচ


সার্বিয়ার রাজনীতিতে আলেকজান্ডার ভুচিচের পতন কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দু’বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এক ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের ব্যালট-রূপান্তর। এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। সার্বিয়ার নভি সাদ (Novi Sad) শহরের রেল স্টেশনের কংক্রিটের ছাউনি ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ১৬ জন সাধারণ মানুষের। সরকারি প্রকল্পে চরম দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং দায়বদ্ধতার অভাবকেই এই মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজপথে নামে তরুণ প্রজন্ম।

ক্রমে সেই আন্দোলন রূপ নেয় ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ (Student List) নামক এক রাজনৈতিক মঞ্চে, যার নির্বাচনী প্রচারের সামনের সারিতে ছিলেন নভি সাদের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টির অধ্যাপক ইলিয়া সার্দানোভিচ (Ilija Srdanovic)। ছাত্রদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, চিকিৎসক ও শ্রমজীবী মানুষ এই আন্দোলনে শামিল হন। প্রবল জনরোষের মুখে গত সেপ্টেম্বরেই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আগাম সাধারণ নির্বাচন (Snap Parliamentary Elections) ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন ভুচিচ। আন্দোলনকারীদের তিনি ‘ব্লকেডার্স’ বা ‘অবরোধকারী’ (Blockaders) বলে কটাক্ষ করেছিলেন এবং দেশকে অস্থির করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছিলেন।

কিন্তু রবিবার (২৫ অক্টোবর, ২০২৬) সার্বিয়ার নির্বাচনে গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটদান হয়। ২৫০ আসনের সার্বিয়ান পার্লামেন্টে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, আর ভুচিচের দক্ষিণপন্থী দল ‘সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টি’ (Serbian Progressive Party-SNS) নেমে আসে ১০৫টি আসনে। হার স্বীকার করে ভুচিচকে বলতে হয়, এটা স্পষ্ট যে আমরা এই নির্বাচনে হেরে গিয়েছি।

অথচ ১৯৯৩ সালে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা ভয়স্লাভ শেশেলের (Vojislav Seselj) হাত ধরে রাজনীতিতে আসা এবং ২০০৮ সালে টমিস্লাভ নিকোলিচের (Tomislav Nikolic) সঙ্গে মিলে এসএনএস (SNS) গঠন করা ভুচিচ ২০১২ সাল থেকে সার্বিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন। তাঁর আমলে সার্বিয়ার জিডিপি (GDP Growth) প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯০ বিলিয়ন ইউরোয় পৌঁছেছিল, বেকারত্ব ২৬ শতাংশ থেকে কমে ৮-৯ শতাংশে নেমেছিল এবং ২০২৪ সালে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) রেকর্ড ৫.২ বিলিয়ন ইউরো ছুঁয়েছিল। কিন্তু বিশিষ্ট সার্বিয়ান সাংবাদিক সাফেতা বিশেভাচ (Safeta Bisevac) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দুশকো রাদোসাভলিয়েভিচের (Dusko Radosavljevic) কথায়, চকচকে মোটরওয়ে আর জিডিপির সংখ্যার আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া খরচ, সরকারি ঋণ, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধীদের দমন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে পঙ্গু করে দেওয়ার সেই স্বৈরাচারী প্রবণতাকেই ব্যালটে শাস্তি দিয়েছে সার্বিয়ার তরুণসমাজ।

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু হয়ে বেলগ্রেড: বিশ্বময় ‘জেন-জি’ বিদ্রোহ

সার্বিয়ার এই পটপরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ (Anti-Discrimination Student Movement) নিছক চাকরির দাবিতে আটকে থাকেনি। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে নির্বাচন ব্যবস্থার ভাঙন, প্রতিষ্ঠান দখল এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তা এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একই ছবি দেখা যায় হিমালয়ের কোলের দেশ নেপালে। দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আবহেই ৪ সেপ্টেম্বর কে পি শর্মা ওলি (K.P. Sharma Oli) সরকার ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করলে ফুঁসে ওঠে নেপালের ‘জেন-জি’ (Nepal Gen Z Revolution)। ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বরের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-যুব বিদ্রোহের মুখে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী ওলি। রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল সংবিধানের ৬১ নম্বর অনুচ্ছেদ মেনে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে (Sushila Karki) অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন এবং পরবর্তীকালে ২০২৬-এর নির্বাচনে যুবসমাজের মুখ বালেন শাহের (Balen Shah) উত্থান ঘটে।

ঢাকা, কাঠমান্ডু এবং বেলগ্রেড, তিনটি ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ সূত্র স্পষ্ট– শাসক যখন মনে করে উন্নয়ন বা জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকারকে খর্ব করা যাবে, তখনই ডিজিটাল যুগের তরুণ প্রজন্ম প্রথাগত বিরোধী দলগুলির তোয়াক্কা না করে সরাসরি রাজপথ ও ব্যালটের দখল নিচ্ছে।

ব্রাজিলে লুলার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন

সার্বিয়ায় যখন ছাত্র আন্দোলনের জয়জয়কার, ঠিক তখনই আটলান্টিকের ওপারে ব্রাজিলে ঘটেছে আর এক রাজনৈতিক মিরাকল। গত ৪ অক্টোবর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় সবাইকে চমকে দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন প্রাক্তন কট্টর দক্ষিণপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর (Jair Bolsonaro) পুত্র তথা লিবারেল পার্টির প্রার্থী ফ্লাভিও বোলসোনারো (যাঁর পিতা ২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে বর্তমানে গৃহবন্দি ও সাজাপ্রাপ্ত)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) প্রকাশ্যেই ফ্লাভিওর প্রথম দফার ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”pt” dir=”ltr”>Caralho, esse é sem dúvidas um dos vídeos mais espetaculares da história do Brasil! Milhões e milhões de pessoas na Avenida Paulista comemorando a reeleição do Lula. A ESQUERDA BRASILEIRA É UM FENÔMENO! https://t.co/LPx9DSVYMJ</p>&mdash; rodriguesˢᶜᶜᵖ (@NJanfren) <a href=”https://x.com/NJanfren/status/2114560720121843952?ref_src=twsrc%5Etfw”>October 26, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>

ব্রাজিলের আধুনিক ইতিহাসে প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়া কোনও প্রার্থীর দ্বিতীয় দফায় বা ‘রান-অফ’ নির্বাচনে (Presidential Runoff) জিতে আসার নজির ছিল না। কিন্তু আশির কোঠায় পৌঁছনো বামপন্থী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা লুলা দা সিলভা এই নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্র বনাম বোলসোনারিজম’ এবং ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের লড়াই’ (Battle for Sovereignty) হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরেন। রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশে লুলা স্পষ্ট জানান, ব্রাজিল কোনও বিদেশি শক্তির ‘খেলার মাঠ’ বা ‘ব্যাকইয়ার্ড’ নয়। শেষ পর্যন্ত তরুণ, প্রান্তিক ও গণতন্ত্রপ্রিয় ভোটারদের বিপুল সমর্থনে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে চতুর্থ বারের জন্য ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন লুলা।

ভারতে দানা বাঁধছে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। ২০২৬ সালে ভারতের ছাত্র ও যুবসমাজ জোড়া ইস্যুতে রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছে, যা গত দেড় দশকে দেশের বৃহত্তম যুব বিক্ষোভ (India Gen Z Protests) হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুন-জুলাই মাসে নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস (NEET Paper Leak) এবং সিবিএসই-র অন-স্ক্রিন মার্কিং বিভ্রাটের জেরে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হয় প্রবল ছাত্র আন্দোলন। প্রথাগত ছাত্র সংগঠনের পাশাপাশি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (Cockroach Janta Party-CJP) মতো তরুণদের মঞ্চ এবং সোনম ওয়াংচুকের অনশন কেন্দ্রকে এমন চাপে ফেলে যে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান (Dharmendra Pradhan) ইস্তফা দিতে বাধ্য হন এবং সরকার কঠোর আইন আনতে বাধ্য হয়।

ছাত্রদের সেই আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের রাজনীতি তোলপাড় হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ‘এসআইআর’-কে (Special Intensive Revision of Electoral Rolls) কেন্দ্র করে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) নেতৃত্বাধীন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনের নামে দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে (Voter Deletion Controversy)। এমনকি খোদ নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই দুই নির্বাচন কমিশনার এই প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ্যে আসে।

দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই থেকে কলকাতা—আইসা (AISA), এসএফআই (SFI), এআইএসএফ (AISF), এনএসইউআই (NSUI)-এর মতো ছাত্র সংগঠনগুলির (নেহা বোরা, সৃজন ভট্টাচার্য, ঐশী ঘোষ, উদয় ভানু চিব প্রমুখ ছাত্র-যুব নেতৃত্ব) পাশাপাশি রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi), মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, দীপঙ্কর ভট্টাচার্যদের মতো ‘ইন্ডিয়া’ জোটের (INDIA Bloc) শীর্ষ নেতৃত্ব রাস্তায় নেমেছেন। গত ১২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট অভিযান ঘিরে রাজধানী রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। আন্দোলনকারীদের দাবি একটাই, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা এবং বিতর্কিত ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিল করা।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হল, দিল্লি ও মুম্বইয়ের রাজপথে আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের একাংশের মুখে সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের স্লোগান শোনা যাচ্ছে। আর এখান থেকেই শুরু হয়েছে শাসক বনাম বিরোধীর তীব্র বাগযুদ্ধ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গয়াল (Piyush Goyal), ললন সিং বা মহারাষ্ট্রের নেতা একনাথ শিন্ডেরা (Eknath Shinde) অভিযোগ তুলেছেন, রাহুল গান্ধী ও ছাত্র সংগঠনগুলির এই আন্দোলনের পিছনে ‘বিদেশি হাত’ (Foreign Hand Allegation) রয়েছে এবং বাংলাদেশ বা নেপালের ধাঁচে ভারতেও অরাজকতা তৈরি করে নির্বাচিত সরকার ফেলার চেষ্টা চলছে। পাল্টা বিরোধীদের দাবি, মানুষের মৌলিক ভোটাধিকার বা ‘এসআইআর’ নিয়ে কারচুপির ক্ষোভ ঢাকতেই শাসকদল ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ খাড়া করছে।

কী বলছে রাজনৈতিক সমীকরণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো, সংসদীয় গণতন্ত্রের গভীরতা এবং বহুত্ববাদী চরিত্র বাংলাদেশ, নেপাল বা সার্বিয়ার তুলনায় অনেক বেশি সুদৃঢ়। ফলে ঢাকা বা কাঠমান্ডুর মতো আকস্মিক অভ্যুত্থানের তত্ত্ব ভারতের ক্ষেত্রে হুবহু খাটে না।

কিন্তু সার্বিয়ায় আলেকজান্ডার ভুচিচের পতন এবং ব্রাজিলে লুলার জয় ভারতের শাসক ও বিরোধী, উভয় শিবিরের জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা। সার্বিয়া দেখিয়েছে, কেবল জিডিপির পরিসংখ্যান বা পরিকাঠামো উন্নয়নের খতিয়ান দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মন পাওয়া যায় না, যদি নির্বাচন কমিশন বা বিচারব্যবস্থার মতো স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা (Institutional Integrity) নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়। ভারতে কর্মসংস্থান, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি ‘এসআইআর’-এর মাধ্যমে ভোটাধিকারের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ছাত্র-যুবদের ক্ষোভকে নিছক ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বা ‘অবরোধকারীদের তাণ্ডব’ বলে লঘু করে দেখলে, রাজপথের সেই অসন্তোষ যে শেষ পর্যন্ত ব্যালট বক্সেই নির্ণায়ক আঘাত হানতে পারে। বেলগ্রেড থেকে ব্রাসিলিয়া আজ সেই দেওয়াললিখনই স্পষ্ট করে দিয়েছে।