বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হিংসা ও নিপীড়নের বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হল। বাংলাদেশের অন্যতম মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’-এর দাবি, ২০২৫ সালে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে অন্তত ৫২২টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান সরাসরি বিরোধীতা করছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক দাবির, যেখানে বলা হয়েছিল, মাত্র ৭১টি ঘটনাই সাম্প্রদায়িক প্রকৃতির।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সাংবাদিক বৈঠকে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ ‘বার্ষিক পর্যালোচনা রিপোর্ট’ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় সংবাদপত্র ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতেই এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
ঐক্য পরিষদের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ৫২২টি ঘটনার ফলে— ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, ২৮টি ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন (ধর্ষণ ও গণধর্ষণ-সহ) ঘটেছে, ৯৫টি উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে, ১০২টি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে, ৩৮টি অপহরণ, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের ঘটনা, ৪৭টি হত্যার হুমকি ও শারীরিক আক্রমণ, ৩৬টি ক্ষেত্রে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন এবং ৬৬টি ঘটনায় জমি, বাড়ি ও ব্যবসা জোর করে দখল করা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ঐক্য পরিষদ আরও সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, নির্বাচনী সময়েই হিংসা আরও বেড়েছে। শুধুমাত্র ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ জানুয়ারির মধ্যেই ৪২টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
১১টি খুন, ১টি ধর্ষণ, ৯টি মন্দির ও গির্জায় হামলা, ২১টি লুঠ, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলের ঘটনা।
মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান, কিন্তু জীবন, জীবিকা, সম্পত্তি ও মর্যাদা নিয়ে ভয় এখনও কাটেনি।’ তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোটাধিকার থেকে দূরে রাখার দায় সরকার, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলিকেই নিতে হবে।’
তিনি কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন মুহাম্মদ ইউনূসের ১৯ জানুয়ারির একটি সমাজমাধ্যম পোস্টের। যেখানে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ৬৪৫টি ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ৭১টি সাম্প্রদায়িক। বাকি ৫৭৪টি ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে দাবি করা হয়।
ঐক্য পরিষদের অভিযোগ, ‘সরকারের সংজ্ঞা অনুযায়ী, মন্দিরের ভিতরে না হলে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, জমি দখল, লক্ষ্যভিত্তিক হামলাকেও সাম্প্রদায়িক হিংসা বলা হচ্ছে না, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন।’
সংগঠনটি আরও অভিযোগ করেছে, সংখ্যালঘু নেতৃত্বকে পরিকল্পিতভাবে হেনস্থা ও অপরাধী বানানো হচ্ছে। বিশিষ্ট হিন্দু নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের কারাবন্দি হওয়া, ঐক্য পরিষদের একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, অনেক নেতার আত্মগোপনে চলে যাওয়া— সবই সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক হিংসা শুধু দেশের ভিতরেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঐক্য পরিষদের স্পষ্ট দাবি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই নিশ্চিত করতে হবে। নচেৎ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভবিষ্যৎ আরও গভীর সংকটে পড়বে বলেই আশঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের।