জাকার্তার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলছিলেন, এই দেশের বাতাসে যে সংস্কৃতির গন্ধ ভাসে, সেই গন্ধ ভারতের মাটিতেও প্রতি মুহূর্তে অনুভব করা যায়। ইন্দোনেশিয়া সফরে গিয়ে বুধবার প্রধানমন্ত্রী পৌঁছে গেলেন যোগ্যকর্তার (Yogyakarta) বিখ্যাত প্রম্বানন মন্দিরে (Prambanan Temple), যেখানে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোওয়ো সুবিয়ান্তোর (Prabowo Subianto) সঙ্গে যৌথভাবে উদ্বোধন করলেন এক বিশাল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের।
প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য (UNESCO World Heritage Site) এবার সাজবে নতুন করে, আর তার পিছনে হাত থাকছে ভারতেরই।
কোথায় এই প্রম্বানন, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
জাভা দ্বীপের যোগ্যকর্তা শহরের কাছে অবস্থিত প্রম্বানন ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় হিন্দু মন্দির কমপ্লেক্স। নবম শতাব্দীতে মাতরম রাজবংশের আমলে তৈরি এই মন্দির মূলত শিবের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত, সঙ্গে রয়েছে বিষ্ণু ও ব্রহ্মার মন্দিরও। গোটা চত্বর জুড়ে একসময় ছিল প্রায় ২৪০টি মন্দির, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিন্দু মন্দিরস্থাপত্যগুলির অন্যতম। কেন্দ্রীয় শিবমন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৪৭ মিটার। মন্দিরের গায়ে খোদাই করা পাথরের ফলকে ফুটে উঠেছে রামায়ণ ও অন্যান্য হিন্দু পুরাণের কাহিনি। আজও এখানে নিয়মিত মঞ্চস্থ হয় বিখ্যাত রামায়ণ ব্যালে (Ramayana Ballet)।
ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আর একাদশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধাক্কায় বহু শতাব্দী ধরে অবহেলিত ছিল এই মন্দির চত্বর। সপ্তদশ শতাব্দীতে ফের আবিষ্কৃত হয় এটি, তারপর ওলন্দাজ ঔপনিবেশিক আমলে শুরু হয় পুনরুদ্ধারের প্রথম চেষ্টা। ১৯৯১ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের তকমা দেয়।
জাকার্তায় কী হল, প্রতিশ্রুতি দিলেন মোদী
মঙ্গলবার ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে সাক্ষরিত হয় একটি লেটার অফ ইনটেন্ট (Letter of Intent), যার ভিত্তিতে শুরু হচ্ছে এই যৌথ সংরক্ষণ প্রকল্প। তার পরদিনই দুই রাষ্ট্রনেতা সশরীরে হাজির হন মন্দির চত্বরে। মোদী নিজে পুজো দেন প্রাচীন এই শিবমন্দিরে, ওম নমঃ শিবায় মন্ত্রোচ্চারণে যোগ দেন উপস্থিত ভক্তরাও।
প্রধানমন্ত্রী পরে জানান, প্রেসিডেন্ট প্রাবোওয়ো তাঁকে কথা দিতে বাধ্য করেছেন যে ২০২৯ সালের মধ্যেই এই পুনরুদ্ধারের কাজ সম্পূর্ণ হবে, আর সেই উপলক্ষ উদযাপন করতে তিনি ফের ইন্দোনেশিয়া যাবেন। কেদারনাথ পুনর্নির্মাণ কিংবা উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরের সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হাজার বছর আগের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের স্মারক নিয়ে কাজ করাটা তাঁর কাছে সৌভাগ্যের। কৈলাস মানসসরোবর আর প্রম্বানন, দুই জায়গাতেই একই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র ধ্বনিত হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুনরুদ্ধারের দায়িত্বে কারা, কী পদ্ধতিতে কাজ
এই প্রকল্পের রূপায়ণে হাত মেলাবে ভারতের প্রত্নতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ (Archaeological Survey of India বা ASI) এবং ইন্দোনেশিয়ার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি। ব্যবহার করা হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অ্যানাস্টাইলোসিস (Anastylosis) পদ্ধতি, যেখানে মূল পাথরগুলিকেই সযত্নে পুনর্বিন্যস্ত করে স্থাপত্যের ঐতিহাসিক সত্যতা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। মূলত মূল চত্বরের ছোট ছোট মন্দিরগুলির সংস্কারেই মনোনিবেশ করবে এএসআই।
শুধু প্রম্বানন নয়, এশিয়াজুড়ে ভারতের হেরিটেজ কূটনীতি
আচমকা এই উদ্যোগ নয়, বরং গত এক দশক ধরে এশিয়া জুড়ে একাধিক প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ স্থাপত্য পুনরুদ্ধারে হাত লাগিয়েছে ভারত। ২০১৪ সালে ভিয়েতনামের মাই সন অভয়ারণ্য, ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার তিরুকেতিশ্বরম মন্দির, ২০১৭ সালে নেপালে ভূমিকম্প পরবর্তী আঠাশটি ঐতিহ্যস্থল, ২০২০-২১ সালে বাংলাদেশের রামনা কালীমন্দির, ২০২২ সালে কম্বোজের আংকোর চত্বর এবং ২০২৪ সালে লাওসের ভাট ফু মন্দির— প্রতিটি ক্ষেত্রেই কেন্দ্রে ছিল একই ভাবনা, ভাগ করে নেওয়া সভ্যতার ইতিহাস সংরক্ষণ। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে প্রম্বানন।
বাংলার সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সুপ্রাচীন যোগ
এই খবরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্কটা নেহাত কাকতালীয় নয়। আজকের পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক, প্রাচীনকালে যা পরিচিত ছিল তাম্রলিপ্ত নামে, ছিল বঙ্গের অন্যতম প্রধান বন্দর। গুপ্তযুগে এই বন্দর থেকেই জাহাজ ছাড়ত জাভা, সুমাত্রা তথা তৎকালীন সুবর্ণদ্বীপ (Suvarnadwipa) বা সুবর্ণভূমির (Suvarnabhumi) উদ্দেশে, আজকের ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলেই যার অবস্থান ছিল। বণিক আর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা একসঙ্গে জাহাজে চড়ে পাড়ি দিতেন সেই সব দূরদেশে, সঙ্গে বয়ে নিয়ে যেতেন ভারতীয় সংস্কৃতি, ধর্ম আর শিল্পরীতি। সেই বিনিময়েরই একটা প্রতিফলন হয়তো দেখা যায় আজকের প্রম্বাননের গায়ে খোদাই করা রামায়ণের কাহিনিতে। ফলে হাজার বছর পরে ভারত যখন এই মন্দির পুনরুদ্ধারে হাত বাড়াচ্ছে, সেই ইতিহাসের সুতোয় বাংলার নামটাও কোথাও গিয়ে জুড়ে যায়।
বর্তমান সময়ে বালি কিংবা যোগ্যকর্তা ভ্রমণে বাঙালি পর্যটকদের আগ্রহও কম নয়। প্রম্বানন সংস্কার সম্পূর্ণ হলে আগামী দিনে এই মন্দির চত্বর বাঙালি ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে বলেই মত পর্যটন মহলের একাংশের।