রাওয়ালাকোটের (Rawalakot) ঈদগাহ মাঠটা এখন একটা তাঁবুর শহর। গত দুই সপ্তাহ ধরে সেখানে খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছেন ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। স্কুলের ছেলেমেয়েরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে নেমেছে রাস্তায়। মহিলারা রয়েছেন মিছিলের সামনের সারিতে। স্লোগান উঠছে, পাকিস্তানি ফৌজ বাহার যাও।
এটা পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর (Pakistan-occupied Kashmir)-এর ছবি। কোনও মনগড়া সিনেমা নয়। ২০২৬ সালের জুনে ঠিক এটাই ঘটছে বাস্তবে।
ইসলামাবাদ এই বিক্ষোভ ঠান্ডা করতে এখন ভাতে মারার চক্রান্ত করছে। নিজেদের দখলে থাকা কাশ্মীরের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় খাবার, পেট্রোল-ডিজেল, এমনকি ওষুধ সরবরাহও আটকে দেওয়া হয়েছে। বিবিসি উর্দু (BBC Urdu), ডন (Dawn) এবং এএফপি (AFP)-র প্রতিবেদন বলছে, চেকপোস্টে আটকানো হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বোঝাই ট্রাক। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য অবরোধের কথা অস্বীকার করছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।
৯ জুন থেকে একটা পয়সাও রোজগার হয়নি, বলছিলেন মুজাফফরাবাদের (Muzaffarabad) দিনমজুর ইখলাক আহমেদ।
শুরুটা ছিল আটার দাম থেকে
এই বিক্ষোভের শিকড় ধরলে পৌঁছতে হবে ২০২৩ সালে। সেই বছর রাওয়ালাকোটের একটি সরকারি গুদামের সামনে ধর্না শুরু করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি ছিল একটাই, আকাশছোঁয়া আটার দামে লাগাম পরাতে হবে।
সেই ফুলকির মতো ছোট ধর্না ক্রমে বড় আগুনে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, আইনজীবী, ছাত্র—সব স্তরের সব পেশার মানুষ একসঙ্গে জড়ো হয়ে তৈরি করেছেন জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (Joint Awami Action Committee)বা JAAC। নেতৃত্বে শওকত নওয়াজ মির (Shaukat Nawaz Mir)।
JAAC এখন ৩৮ দফা দাবিতে লড়ছে। ভর্তুকিতে আটা ও বিদ্যুৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিচার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকার। আর সবচেয়ে বিস্ফোরক দাবিটা হল, পাকিস্তানে বসবাসকারী কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য PoK বিধানসভায় সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করতে হবে। JAAC-র যুক্তি, এই ব্যবস্থায় পাকিস্তানের বড় রাজনৈতিক দলগুলো মুজাফফরাবাদের সরকারকে নিজেদের মতো চালাতে পারছে।
সরকার বলছে, ওরা সন্ত্রাসবাদী
৫ জুন, ২০২৬। পাকিস্তান PoK-তে ২৭ জুলাই আঞ্চলিক নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করল। আর সেদিনই JAAC-কে সন্ত্রাসদমন আইনে নিষিদ্ধ সংগঠন বলে ঘোষণা করা হল। ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করা হল গোটা অঞ্চলে।
এর প্রতিক্রিয়া হল ভয়াবহ।
৮ জুন রাওয়ালাকোটে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধল। কমপক্ষে ১১ জন নিহত, ৭০ জনের বেশি আহত। স্থানীয় সূত্র ও বিরোধী নেতাদের দাবি মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি। অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন কমপক্ষে ৫৮ জন মারা গিয়েছেন, যদিও সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
৯ জুন JAAC ডাক দিল ধর্মঘটের। অভূতপূর্ব সর্বাত্মক সাড়া মিলল। মুজাফফরাবাদ, পুঞ্চ (Poonch), বাগ (Bagh), মিরপুর (Mirpur)… সর্বত্র দোকানপাট বন্ধ, গণপরিবহন বন্ধ। ভীমবের (Bhimber) থেকে মুজাফফরাবাদ পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার ‘লং মার্চ’ আটকে দিল আধাসামরিক বাহিনী। বিক্ষোভকারীরা চিন-পাকিস্তান মৈত্রীর প্রধান সড়ক কারাকোরাম হাইওয়েও (Karakoram Highway) বেশ কিছুক্ষণের জন্য অবরুদ্ধ করলেন।
বিশ্ব নজর রাখছে
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) পাকিস্তানের এই দমননীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। বলেছে, JAAC-কে নিষিদ্ধ করা বেআইনি এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
ব্রিটেনের ৫০-এরও বেশি সাংসদ ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছেন। কারণ ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ব্রিটিশ কাশ্মীরিরা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
ইসলামাবাদের জন্য বিপদের ঘণ্টা
পাকিস্তান এই মুহূর্তে একটা সঙ্কটজনক জায়গায় দাঁড়িয়ে। একদিকে বিক্ষোভকারীরা রুজি-রোজগার হারাচ্ছেন, বন্ধ ব্যবসা। অন্যদিকে বন্ধ ওষুধের দোকান, বন্ধ পেট্রোল পাম্প। মানবিক পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে।
JAAC নেতারা বলছেন, রাষ্ট্র নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বলছে, এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বাভাবিক পদক্ষেপ।
কিন্তু ৭০ হাজার মানুষের একটা তাঁবুশহর, রাস্তায় স্কুলছাত্রদের স্লোগান অথবা খাবার আর ওষুধ থেকে বঞ্চিত করে বিক্ষোভ দমনের মরিয়া চেষ্টা– এই ঘটনাগুলো ‘স্বাভাবিক’ শব্দটার সঙ্গে খাপ খায় না।
PoK এই মুহূর্তে ফুটছে। বিদ্রোহের আগুন যে কোনও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা পাকিস্তানেই।