Explainer: সাইবেরিয়ায় ল্যাবকর্মীর রহস্যমৃত্যুতে প্লেগের আতঙ্ক, ভারতের কি চিন্তার কারণ আছে?

Russian pneumonic plague scare: What it means for India (Image; Magnific)

সাইবেরিয়ার ইরকুটস্কে (Irkutsk) এক ২৮ বছরের ল্যাবরেটরি কর্মীর মৃত্যু ঘিরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তিনি কাজ করতেন প্লেগ নিয়ে গবেষণারত এক সংস্থায়। সন্দেহ, মৃত্যুর পিছনে থাকতে পারে নিউমোনিক প্লেগ (Pneumonic Plague)। রুশ কর্তৃপক্ষ অবশ্য একে বলছে অজানা কারণের নিউমোনিয়া। তাহলে সত্যিই কি প্লেগ ফিরছে? ভারতের কি ভয় পাওয়ার কিছু আছে?

ঠিক কী ঘটেছে ইরকুটস্কে?

ইরকুটস্কের অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (Irkutsk Anti-Plague Research Institute) ওই কর্মী গুরুতর নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যান।এরপরই তাঁর সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ জনকে এখন চিকিৎসকদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।


রাশিয়ার জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা রোসপোট্রেবনাডজর (Rospotrebnadzor) জানিয়েছে, মৃতার শরীরে ওই ল্যাবে সংরক্ষিত কোনও জীবাণু মেলেনি। প্রতিষ্ঠানে কোনও জরুরি পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। গত ১০ দিনে অন্য কর্মীদের কারও সংক্রমণের অভিযোগও নেই। তাই ল্যাব থেকে ভয়ঙ্কর প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে, এই দাবি সম্পূর্ণ অমূলক।

সংস্পর্শে আসা লোকজনের পরীক্ষায় অবশ্য দু’জনের কোভিড (COVID-19) ও দু’জনের রাইনোভাইরাস (Rhinovirus) ধরা পড়েছে। এর সঙ্গে ওঅ মহিলার মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আমেরিকার সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CDC) পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে বলে জানা গিয়েছে।

টেস্টটিউব ভাঙার গল্প সত্যি?

কিছু রুশ সংবাদমাধ্যমের দাবি, নমুনা সংগ্রহের সময় জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া ভরা টেস্টটিউব ভেঙে ফেলেছিলেন ওই কর্মী। কিছু প্রতিবেদনে আরও একটি সম্ভাবনার কথা এসেছে। প্রতিবেশী বুরিয়াতিয়ায় (Buryatia) মঙ্গোলিয়া সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় প্লেগের খবর ছিল। সেখান থেকে কাজ সেরে ফিরেছিলেন তিনি।

তবে কোনও দাবিই সরকারিভাবে স্বীকার করা হয়নি। প্লেগ নিশ্চিত করতে হলে ল্যাব পরীক্ষা লাগে। তেমন কোনও পরীক্ষা হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।

নিউমোনিক প্লেগ আসলে কী?

প্লেগের জীবাণুর নাম ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস (Yersinia pestis)। এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢুকলে তিন ধরনের প্লেগ হতে পারে।

লসিকাগ্রন্থিতে আক্রমণ করলে হয় বিউবোনিক প্লেগ (Bubonic Plague)। গ্রন্থি ফুলে বড় গুটি বা বিউবো তৈরি হয়। রক্তে ছড়ালে হয় সেপ্টিসেমিক প্লেগ (Septicemic Plague)। আর ফুসফুসে সংক্রমণ হলে হয় নিউমোনিক প্লেগ।

WHO-র তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুসে ছড়ালো সেটিই প্লেগের সবচেয়ে মারাত্মক রূপ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একমাত্র নিউমোনিক প্লেগই মানুষ থেকে মানুষে সরাসরি ছড়াতে পারে।

কতটা সহজে ছড়ায়?

হামের মতো বাতাসে ভেসে থাকে না এই জীবাণু। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো দ্রুতও ছড়ায় না। রোগী কাশলে বা রক্তমাখা কফ ফেললে ভারী শ্বাসকণার মাধ্যমে ছড়ায়।

ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি যাঁরা মাস্ক ছাড়া রোগীর দু’মিটারের মধ্যে থাকেন, সরাসরি সেবা করেন। রোগী নিজে খুব অসুস্থ হওয়ার পরেই সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। তাই দূরপাল্লার ভ্রমণে কারও পক্ষে লুকিয়ে সংক্রমণ বয়ে বেড়ানো কঠিন।

লক্ষণ কী, চিকিৎসা কতটা কার্যকর?

উপসর্গ শুরু হয় হঠাৎ। সাধারণত এক থেকে তিন দিনের মধ্যে। কখনও কখনও সাত দিন পর্যন্ত লাগে। প্রথমে আসে প্রবল জ্বর, কাঁপুনি, তীব্র মাথাব্যথা ও চরম দুর্বলতা। তার পরে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা। কাশির সঙ্গে জলের মতো বা রক্তমাখা গোলাপি কফ বেরোয়।

সুখবর হল, চিকিৎসা আছে। জেন্টামাইসিন (Gentamicin), সিপ্রোফ্লক্সাসিন (Ciprofloxacin) বা ডক্সিসাইক্লিনের (Doxycycline) মতো অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) খুব কার্যকর। তবে সময় এখানে সবচেয়ে বড় কথা। উপসর্গ শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু না হলে মৃত্যুঝুঁকি দ্রুত বাড়ে। WHO-র নির্দেশ অনুযায়ী, রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সাত দিনের প্রতিষেধক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।

ভারতে ঝুঁকি কতটা?

নয়াদিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জতিন আহুজা বলেছেন, শুধু রুশ খবরের ভিত্তিতে জনমনে আতঙ্কের কারণ নেই। তবে কোনও রোগীর লক্ষণ মিলে গেলে চিকিৎসকদের দ্রুত রোগ চিনতে হবে। তাঁর মতে, নিউমোনিক প্লেগ বিরল। কিন্তু দ্রুত শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত পদক্ষেপ এখানে অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের হিসেবে ভারতের ঝুঁকি এই মুহূর্তে অত্যন্ত কম। কারণ এখনও পর্যন্ত রাশিয়ায় প্লেগ নিশ্চিত হয়নি। কারও থেকে কারও সংক্রমণের প্রমাণও মেলেনি।

ভারত অবশ্য এই রোগের স্মৃতি ভোলেনি। ১৯৯৪ সালে গুজরাতের সুরাট ঘিরে প্লেগের আতঙ্কে দেশজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। পাঁচ হাজারের বেশি সন্দেহজনক ঘটনার খবর এসেছিল। কলকাতাতেও সন্দেহজনক রোগীর কথা শোনা গিয়েছিল। ১৮টির বেশি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ভারতে উড়ান বন্ধ করেছিল। পরে WHO-র দলের তদন্তে একে সীমিত সংক্রমণ বলা হয়। বড় শহরগুলিতে সংক্রমণ ছড়ানোর কোনও প্রমাণ মেলেনি। আতঙ্ক আর অর্থনৈতিক ক্ষতিই সেবার বড় হয়ে উঠেছিল।

বিদেশ থেকে অসুস্থ যাত্রী এলে কী হবে?

ভারতের বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে এয়ারপোর্ট হেলথ অর্গানাইজেশন (Airport Health Organisation)। উড়ানে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে ক্রু বিমান নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে জানায়। বিমানটিকে আলাদা বে-তে নামানো হয়। রোগীকে বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সে নির্ধারিত সংক্রামক রোগের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আশপাশের আসনের যাত্রীদের খুঁজে প্রতিষেধক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। নমুনা যায় ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলে (NCDC)।

কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও একই কাঠামো প্রযোজ্য। রাজ্যে সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য রয়েছে বেলেঘাটার আইডি অ্যান্ড বিজি হাসপাতাল (ID & BG Hospital)। এমন রোগীর ক্ষেত্রে ভ্রমণের ইতিহাস জেনে নেওয়াই সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

সাধারণ জ্বর-নিউমোনিয়ার সঙ্গে গুলিয়ে যাবে না তো?

যাবে, যদি সতর্কতা না থাকে। জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট আর নিউমোনিয়া এই লক্ষণগুলি আলাদা করে প্লেগের প্রমাণ নয়। তাই দ্রুত অবনতি হতে থাকা রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা কয়েকটি প্রশ্ন করেন। সম্প্রতি বিদেশযাত্রা হয়েছে কি না। প্লেগপ্রবণ এলাকায় গিয়েছিলেন কি না। ইঁদুর বা সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এসেছেন কি না। ল্যাবে কাজ করেন কি না। এই ইতিহাসই বলে দেয় বিশেষ পরীক্ষা ও সরকারি বিজ্ঞপ্তি জরুরি কি না।

জীবাণু কি দ্রুত বদলে যায়?

না। করোনার মতো আরএনএ ভাইরাস (RNA virus) যে গতিতে বদলায়, ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস সেভাবে বদলায় না। তাই এখনকার আসল প্রশ্ন তিনটি। জীবাণু সত্যিই আছে কি না। মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে কি না। আর ওষুধে সাড়া দিচ্ছে কি না।

ঝুঁকির হিসেব?

একে প্লেগের প্রাদুর্ভাব বলা এখনই ঠিক নয়। রুশ কর্তৃপক্ষ ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস সংক্রমণ নিশ্চিত করলে এবং সংক্রমণ ছড়ানোর প্রমাণ মিললে ছবিটা বদলাবে। একাধিক জায়গায় ক্লাস্টার বা সম্প্রদায়ের মধ্যে টানা সংক্রমণ দেখা দিলে ভারতের ঝুঁকির হিসেবও নতুন করে কষতে হবে। একটিমাত্র সন্দেহজনক ঘটনা, এমনকি ল্যাবে সংস্পর্শের সন্দেহ থাকলেও, সেই পর্যায়ে পড়ে না।