ইসলামাবাদ, ৩ ফেব্রুয়ারি— দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সাক্ষরতার নিরিখে এখনও সবার নীচে পাকিস্তান। সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, পাকিস্তানে ১০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের মধ্যে মাত্র ৬৩ শতাংশ পড়তে ও লিখতে পারেন। এই তথ্য প্রকাশ করেছে ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন নেটওয়ার্ক’ বা ফাফেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই পর্যালোচনা নতুন করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ফাফেনের এই পর্যালোচনা তৈরি হয়েছে পাকিস্তান সোশ্যাল অ্যান্ড লিভিং স্ট্যান্ডার্ডস মেজারমেন্ট—হাউসহোল্ড ইন্টিগ্রেটেড ইকনমিক সার্ভে ২০২৪–২০২৫-এর সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে। পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাঙ্কের দক্ষিণ এশিয়ার সাক্ষরতা সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮–২০১৯ সালে পাকিস্তানের সাক্ষরতার হার ছিল ৬০ শতাংশ, যা ছয় বছরে বেড়ে হয়েছে মাত্র ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ, দীর্ঘ সময়েও উন্নতি হয়েছে মাত্র তিন শতাংশ পয়েন্ট।
শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ২৪ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশে এই হারে উন্নতি ‘অত্যন্ত ধীর এবং উদ্বেগজনক’। শুধু সামগ্রিক হারই নয়, রিপোর্টে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লিঙ্গ ও প্রাদেশিক বৈষম্যের ছবিও। তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের সাক্ষরতার হার যেখানে ৭৩ শতাংশ, সেখানে মহিলাদের ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছে ৫৪ শতাংশে।
প্রাদেশিক স্তরেও চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। পাঞ্জাবে সাক্ষরতার হার তুলনামূলক বেশি, ৬৮ শতাংশ। সিন্ধু ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় এই হার ৫৮ শতাংশ করে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বালুচিস্তানে, যেখানে সাক্ষরতার হার মাত্র ৪৯ শতাংশ।
যুব সমাজের ক্ষেত্রে ছবিটা কিছুটা আলাদা। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭ শতাংশ। কিন্তু ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৬০ শতাংশ। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
ফাফেন জানিয়েছে, এই সমীক্ষায় ‘সাক্ষর’ বলতে সেই ব্যক্তিকেই ধরা হয়েছে, যিনি ১০ বছর বা তার বেশি বয়সে একটি সাধারণ বাক্য পড়তে, বুঝতে এবং একটি সহজ বাক্য লিখতে পারেন।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের আর্থসামাজিক চাপও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জানুয়ারিতে প্রকাশিত গ্যালাপ পাকিস্তানের এক সমীক্ষায় জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের বহু পরিবার এখন খাদ্য ও শিক্ষা—দুটোই বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। গত ২০ বছরে পারিবারিক খরচের ধরণে বড়সড় পরিবর্তন হয়েছে।
হাউসহোল্ড ইন্টিগ্রেটেড ইকনমিক সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্যে পরিবারের মোট খরচের অংশ কমে ৪৩ শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে বাসস্থান ও বিদ্যুৎ-জলের মতো পরিষেবায় খরচ বেড়ে ১৫ শতাংশ থেকে প্রায় এক চতুর্থাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা, প্রকৃত আয় দুর্বল হওয়া ও খাদ্যের পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রমাণের সঙ্গে এই প্রবণতা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, খাদ্য সস্তা হয়নি—বরং মানুষ বাধ্য হয়ে খাবার কমিয়ে দিচ্ছে, যাতে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য স্থায়ী খরচ সামলানো যায়।
এই চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষায়। ২০২৪–২০২৫ সালের সমীক্ষা জানাচ্ছে, মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য অনিশ্চয়তায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ২০১৮–২০১৯ সালের এক-ষষ্ঠাংশ থেকে বেড়ে এক-চতুর্থাংশে পৌঁছেছে। ফলে বর্তমান জীবিকা যেমন কঠিন হয়ে উঠছে, তেমনই ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত।
ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল অ্যান্ড পলিসি সায়েন্সের শিক্ষা সংক্রান্ত পনেরোতম বার্ষিক রিপোর্ট আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম বার শিক্ষার মোট খরচের বড় অংশ বহন করছে সাধারণ পরিবারগুলি। মোট ৫.০৩ ট্রিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি শিক্ষাখরচের মধ্যে পরিবারের ব্যয় ২.৮ ট্রিলিয়ন রুপি, আর সরকারি খাতের অবদান ২.২৩ ট্রিলিয়ন রুপি।
এই পারিবারিক খরচের বড় অংশই যাচ্ছে বেসরকারি স্কুলের ফি, গৃহশিক্ষা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও পরিকাঠামো নিয়ে অনাস্থার কারণেই মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষার পথে হাঁটছেন।
সব মিলিয়ে, সাক্ষরতার হার থেকে শুরু করে খাদ্য ও শিক্ষাখরচ—সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তান এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতি দ্রুত বদলানো না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।