পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে অশান্তি দানা বাঁধতেই সরাসরি তার আঁচ এসে পড়ল পেট্রল পাম্পে। ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানে শুক্রবার রাত থেকেই লিটার প্রতি পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ল প্রায় ১৩ থেকে ১৪ টাকা। সাম্প্রতিক অতীতে এটিই দেশটির সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা। আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দর ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়াতেই এই ধাক্কা, জানিয়েছে পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম বিভাগ (Petroleum Division)।
ঠিক কতটা বাড়ল?
পাকিস্তান সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ১৩.১৮ পাকিস্তানি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১০.৭১ টাকায় (প্রায় ১০৬.৬ ভারতীয় টাকা)। হাই স্পিড ডিজেলের (HSD) দাম বেড়েছে ১৩.৮০ টাকা। ফলে নতুন দর দাঁড়িয়েছে ৩২৩.৩০ টাকা (প্রায় ১১০.৯ ভারতীয় টাকা)। নতুন দর কার্যকর হয়েছে ১১ জুলাই থেকে। এর আগের সপ্তাহে অবশ্য সামান্য স্বস্তি মিলেছিল, তখন দুই জ্বালানিরই দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২ টাকা কমানো হয়েছিল।
কেন হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধি?
ইরান ও আমেরিকার (US-Iran) মধ্যে ফের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় সম্প্রতি অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগে আমেরিকা ইরানের একাধিক সামরিক ও কৌশলগত ঘাঁটিতে ফের বিমানহানা চালানোর পরেই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা তীব্র হয়। ব্রেন্ট ক্রুড (Brent crude) সাময়িকভাবে ব্যারেল প্রতি ৮০ মার্কিন ডলার ছুঁয়ে ফেলে, যদিও পরে কিছুটা নেমে বর্তমানে তা ঘোরাফেরা করছে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭৫.৮ ডলারের (প্রায় সাত হাজার দুশো টাকা) আশপাশে। পশ্চিম টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডাব্লুটিআই (WTI) রয়েছে প্রায় ৭১.৩ ডলারে (প্রায় ছয় হাজার আটশো টাকা)।
রাজস্ব চাপও দায়ী
শুধু আন্তর্জাতিক বাজারই নয়, আইএমএফের (IMF) সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কড়া রাজস্ব শর্ত মেনে চলতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। তার জেরেও সরকার জ্বালানিতে নানা কর ও লেভি বাড়িয়ে চলেছে। জুলাইয়ের গোড়া থেকেই ক্লাইমেট সাপোর্ট লেভি (climate support levy) দ্বিগুণ করে লিটার প্রতি পাঁচ টাকা করা হয়েছে। পেট্রোলিয়াম লেভিও (petroleum levy) পেট্রলে বেড়ে পৌঁছেছে লিটার প্রতি আশি টাকায়, যা এখনও পর্যন্ত রেকর্ড। সব মিলিয়ে পেট্রলে করের বোঝা এখন লিটার প্রতি প্রায় ৯৫ টাকা, ডিজেলে প্রায় ১০১ টাকা।
ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের জ্বালানি সস্তা?
পাকিস্তানি টাকা থেকে ভারতীয় টাকায় রূপান্তর করলে ছবিটা বেশ চমকপ্রদ। বর্তমান বিনিময় হারে (১ পাকিস্তানি টাকা প্রায় ০.৩৪৩ ভারতীয় টাকার সমান) পাকিস্তানের পেট্রলের দাম দাঁড়ায় লিটার প্রতি প্রায় ১০৬ দশমিক ৬ টাকা, যা কলকাতার এদিনের পেট্রলের দর ১১৩.৫১ টাকার চেয়ে সস্তা। কিন্তু ডিজেলের ক্ষেত্রে উলটপুরাণ। পাকিস্তানের ডিজেল রূপান্তরিত হয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১০.৯ টাকা, যা কলকাতার ৯৯.৮২ টাকার ডিজেলের চেয়ে বেশ খানিকটা মহার্ঘ। অর্থাৎ, পেট্রলে সস্তা হলেও ডিজেলে ভারতের চেয়ে বেশি পাকিস্তানের দাম। দিল্লির পেট্রল অবশ্য এখনও একশোর সামান্য উপরে, ১০২.১২ টাকা, ডিজেল ৯৫.২০ টাকা, ফলে সেই তুলনায় পাকিস্তানের দু’টি জ্বালানিই বেশি দামি। মুম্বাইয়ে পেট্রল ১১১.২১ টাকা এবং ডিজেল ৯৭.৮৩ টাকা।
দাম নির্ধারণের পদ্ধতিতেও ফারাক
ভারতে তেল সংস্থাগুলি (Oil Marketing Companies) প্রতিদিন সকালে আন্তর্জাতিক অশোধিত তেলের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে, যাকে বলা হয় ডায়নামিক প্রাইসিং (dynamic pricing)। অন্য দিকে পাকিস্তানে সরকার ১৫ দিন অন্তর বা প্রয়োজনে সপ্তাহভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে দাম ঘোষণা করে, যেখানে করের হার সরাসরি সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। এই কাঠামোগত ফারাকের কারণেই একই সময়ে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বাড়লেও দুই দেশের পাম্পে তার প্রভাব সমান পড়ে না।
সাধারণ মানুষের উপর কতটা চাপ?
পাকিস্তানে পেট্রল মূলত ব্যবহার করেন ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরবাইক এবং ছোট যাত্রিবাহী যানের চালকেরা, ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলির উপর এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়বে। ডিজেলের দাম বাড়া মানে পণ্য পরিবহণ, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং শিল্পক্ষেত্রেও খরচ বাড়ার আশঙ্কা, যার জেরে মূল্যবৃদ্ধির (inflation) চাপ আরও বাড়তে পারে গোটা অর্থনীতিতে।
এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হল, যে ভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে তার জেরে ভারতও পাকিস্তানের মতো জ্বালানি মহার্ঘ করতে বাধ্য হবে কি না?