Explainer: ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে? নোবেল প্রাইজের জন্য মহাকাশের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প

Donald Trump speaking at CPAC in Washington D.C. on February 10, 2011 (Image: Gage Skidmore)

আর মাত্র সাত দিন। আগামী ৯ অক্টোবর, শুক্রবার ওসলোয় ঘোষণা হবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার (Nobel Peace Prize 2026) বিজয়ীর নাম। এ বছর আলোচনায় যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) আর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি (Mark Carney), তেমনই এক অদ্ভুত প্রতিযোগী আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station)। শেষমেশ সত্যিই কার ঝুলিতে যেতে পারে এই সম্মান, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সুদানের স্বেচ্ছাসেবকরাও অবশ্য ফেভারিট হিসেবে আছেন তালিকায়।

কতজন লড়ছেন, পুরস্কারমূল্য কত?

এ বছর নোবেল কমিটির কাছে মনোনয়ন এসেছে ২৮৭টি, যার ২৫ শতাংশের বেশি কোনও না কোনও সংস্থা বা সংগঠন। বিজয়ীর হাতে উঠবে ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনার। ভারতীয় মু্দ্রায় যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে এগারো কোটি টাকা। তবে মনোনীতদের তালিকা গোপন রাখা হয় ৫০ বছর। মনোনয়নের শেষ দিন ছিল ৩১ জানুয়ারি। ফলে কে আদৌ মনোনীত, তা বাইরে থেকে নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। যা চলছে, সবই আন্দাজ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ।


ট্রাম্প পিছিয়ে?

নোবেল পাওয়ার ইচ্ছে ট্রাম্প কোনও দিনই লুকোননি। নিজের কৃতিত্বে তিনি আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবি করে আসছেন। গত বছর শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো (Maria Corina Machado)। পরে ট্রাম্প নিজেই সামাজিক মাধ্যমে জানান, মাচাদো তাঁকে নিজের পদক দিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, পদকের মোহ তাঁর বড়ই প্রবল।

কিন্তু এ বছর হিসেব বদলে গিয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইজরায়েলি যুদ্ধ চলছে, আর সেটাই ট্রাম্পের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা। অসলোর শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান PRIO-র ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর হোকন ইয়েরলো সরাসরিই বলেছেন, যুদ্ধে লিপ্ত কোনও ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের পক্ষে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বুকিদের খাতায় ট্রাম্প অবশ্য ১২/১ থেকে ১৪/১ দরে আছেন এবং সবচেয়ে বেশি টাকার জুয়া খেলা হচ্ছে তাঁর নামেই। কিন্তু পূর্বাভাস সংক্রান্ত বড় বাজার কালশি (Kalshi) বলছে, ট্রেন্ডের বিচারে তাঁর সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

উল্লেখ্য, আলফ্রেড নোবেলের উইলেও লেখা ছিল, দেশে দেশে সৌভ্রাতৃত্ব বাড়ানো আর সেনাবাহিনী কমানোর কাজটি গুরত্ব দিয়ে করতে হবে। এই প্রেক্ষিতে কমিটির প্রধান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেছেন, কাউকে তাঁর প্রভাবের কারণে পুরস্কার দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, তাঁরা পুরো ছবিটাই বিবেচনা করেন।

কার্নির নাম কেন?

শুল্ক নিয়ে ট্রাম্পের মুখে  মুখে তর্ক করা, হুমকিকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করা এবং মাঝারি শক্তির দেশগুলিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট হওয়ার ডাক দিয়ে কার্নি আলোচনায় এসেছেন। কালশি-তে একসময় তিনি ১৪ শতাংশ সম্ভাবনা ছুঁয়ে সবার ওপরে উঠে যান। কিন্তু সেই জায়গা বেশিদিন টেকেনি, কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নেমে যান ষষ্ঠ স্থানে।

মনে রাখা দরকার, বাজির দর আর নোবেল কমিটির মন এক জিনিস নয়। তাছাড়া কার্নি মনোনীত কি না, তা-ও অজানা। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নেলসন ওয়াইজম্যানের মতে, নোবেল প্রাইড এবার যার হাতেই উঠুক, ট্রাম্প খুশি হবেন না। আর যদি কার্নি পেয়ে যান, তবে কানাডার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক আরও তেতো হতে বাধ্য।

আসল ফেভারিট কারা?

এখানেই আসল চমক। রাজনীতির বড় নামগুলি নয়, এগিয়ে মাটির কাছের সংগঠন। ১ অক্টোবরের হিসাবে কালশি-তে সবার আগে সুদানের এমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস (Emergency Response Rooms বা ERR), এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১৪ শতাংশ। তার পরে রয়েছে মাইকোলা কুলেবা ও সেভ দ্য চিলড্রেন এবং ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (Doctors Without Borders)।

ERR আসলে কী? সুদানের গৃহযুদ্ধের মধ্যে পাড়ার স্বেচ্ছাসেবকদের গড়া এই নেটওয়ার্ক সর্বজনীন রান্নাঘর, চিকিৎসা আর মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানোর কাজ চালায়। গত বছর তারা পেয়েছে র‍্যাফটো পুরস্কার ও রাইট লাইভলিহুড পুরস্কার। তালিকায় আছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটিও (Committee to Protect Journalists)। নারী প্রার্থীদের মধ্যে ঘুরছে গাজার চিকিৎসক সারা আল-সাক্কা আর রুশ বিরোধী নেত্রী ইউলিয়া নাভালনায়ার নাম।

মহাকাশ স্টেশন কেন?

PRIO-র এ বছরের তালিকায় সবার আগে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। যুক্তিটা সহজ। মাটির পৃথিবীতে সম্পর্ক যত তিক্তই হোক, প্রায় পঁচিশ বছর ধরে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি এখানে একসঙ্গে কাজ করছে। ইয়েরলোর কথায়, পৃথিবীতে নানা মতের মধ্যে মিলমিশ আর পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক যখন ভাঙছে, তখন এই স্পেস স্টেশনটি সহযোগিতার বিরল প্রতীক।

কমিটি  কী দেখে?

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কমিটি মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নারীর অধিকারের মতো তুলনামূলক ছোট পরিসরের কাজকে গুরুত্ব দিয়েছে। সেই ধারা বজায় থাকলে ERR বা সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটির মতো নাম এগিয়ে থাকবে। আবার সভভ্যতার সংকটের মুহূর্তে আন্তর্জাতিক আদালত বা মহাকাশ স্টেশনের মতো প্রতীকী বাছাইও অসম্ভব নয়।

এরপর কী?

৯ অক্টোবর ঘোষণা, আর ১০ ডিসেম্বর ওসলো সিটি হলে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের একটাই সতর্কবার্তা, নোবেল শান্তি পুরস্কারের পূর্বাভাস বরাবরই অনিশ্চিত। অতীতে বহুবার বাজির ঘোড়ার বদলে অচেনা নামই জিতেছে। তাই আগাম কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত না হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।