নেপালের হরপা বানে মৃতের সংখ্যা ছোঁবে ১০ হাজার, ৭ মিনিটের জল-তাণ্ডবে এখনও নিখোঁজ বাংলার পর্যটকরা

Machines clear a road at the mudslide-hit area in Gyirong (Photo: Xinhua via IANS)

নেপালের হিমালয়ে হিমবাহ ধসের (glacier collapse) পর আকস্মিক বন্যায় (flash flood) প্রাণহানির সংখ্যা ছাড়াবে ১০ হাজার! এমনই আশঙ্কার কথা শোনালেন নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে (Swarnim Wagle)। দিল্লির এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, মৃত ও নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন তীর্থযাত্রী, সাধারণ পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং ছোট দোকানদারেরা।

এখন প্রশ্ন হল, তাঁর আশঙ্কার সংখ্যাটা কতটা বাস্তবের কাছাকাছি? ২৬ আগস্টের ওই বিপর্যয়ে নেপালে মৃতের সংখ্যা এখন ১৪০০ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ প্রায় ছয় হাজার। তিব্বতের দিকে চিনের হিসাবে মৃত ৪৩, নিখোঁজ ৫১৯। সেখানকার সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, কারণ বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ রয়েছে। দুই দিক মিলিয়ে মৃত ও নিখোঁজ প্রায় আট হাজার। তবে নিখোঁজ মানেই মৃত নয়। নেপালের বিপর্যয় ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (NDRRMA) তালিকা যাচাই করে বারবার সংশোধনও করছে।

সাত মিনিটের বিপর্যয়


২৬ আগস্ট সকাল। আকাশ পরিষ্কার। কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে না। তবু লাংটাং লিরুং (Langtang Lirung) শৃঙ্গের কাছে ভেঙে পড়ল হিমবাহের বিশাল অংশ।

কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Calgary) ভূতাত্ত্বিক ড্যানিয়েল শুগারের (Daniel Shugar) উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ বলছে, প্রায় ৫.২ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের চাঙড় খাড়া নেমে এসেছে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থার (USGS) বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ওই সময় ধরা পড়েছিল প্রবল কম্পনও। যদিও তা ভূমিকম্প নয়। বিপর্যয়ের সংকেত এসেছিল এই ধসের ধাক্কা থেকেই। প্রথমে ভূমিকম্পের কথা বলা হয়েছিল। পরে সেই তত্ত্ব বদলে যায়।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, ওই আছড়ে পড়া বিপুল বরফ ঘর্ষণে গলে যায়। জল, পাথর আর কাদা মিলে তৈরি হয় ভয়ংকর স্রোত। যার গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। ধসের সাত মিনিটের মধ্যে সেই স্রোত পৌঁছে যায় গিরং (Gyirong) সীমান্ত বন্দরে। বন্দরের সীমান্ত চৌকি প্রায় মুছে গিয়েছে। নেপালের দিকে ভোটেকোশি (Bhotekoshi) বা ত্রিশূলী নদীর (Trishuli River) ৭২ কিলোমিটার জুড়ে একের পর এক জনপদ তছনছ হয়। কোথাও নদীর তল থেকে ৮০ মিটার উচ্চতায় উঠেছিল জল। পলি জমেছে দেড় মিটারেরও বেশি। যদিও এই মারাত্মক জল-তাণ্ডবের চূড়ান্ত কারণ নিয়ে অবশ্য এখনও তদন্ত চলছে।

কেন নেই আগাম সতর্কবার্তা

কারণ এই এলাকার সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরিই হয়েছিল অন্য ধরনের বিপদের জন্য। চিন ও নেপালের বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা (early warning system) চালাচ্ছেন। জলস্তর মাপার যন্ত্র বসানো ছিল বর্ষার বন্যার চরিত্র ধরার জন্য। কিন্তু এ বার বৃষ্টিই ছিল না। পাশাপাশি্ নদীপথের উপরের দিকের নজরদারি কেন্দ্রগুলিও ভেসে যায় সংকেত পাঠানোর আগেই। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের (Stimson Center) এক সিনিয়র ফেলো এই অঞ্চলকে নজরদারির জন্য অন্ধ এলাকা বা ব্লাইন্ড সাইট বলে উল্লেখ করেছেন।

এত কিছুর পরও তবু কিছু প্রাণ বেঁচেছে। যেমন নুয়াকোটের ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের (Tribhuvan Trishuli Secondary School) প্রধানশিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি (Rajendra Dawadi) চার দফা সতর্কবার্তা পেয়ে ৯০০ পড়ুয়াকে নিরাপদ উঁচু ডায়গায় সরিয়ে নিয়ে যান। বন্যা আছড়ে পড়ার মাত্র ১০ মিনিট আগে।

মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছোঁয়ার আশঙ্কা

পরিসংখ্যান বলছে, নিখোঁজদের বড় অংশই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের (hydropower project) কর্মী। নেপালের স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক সংগঠনের (IPPAN) হিসাবে, ১১টি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৯৩৪ জন নিখোঁজ। আপার ত্রিশূলী ৩এ (Upper Trishuli 3A) প্রকল্পের সুড়ঙ্গে অনেকের আটকে থাকার আশঙ্কা ছিল। সে কারণেই ৩১ আগস্ট সুড়ঙ্গে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঢোকার পথ খোঁজে নেপালি সেনা। যদিও তেমন লাভ কিছু হয়নি।

নিখোঁজদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিকও আছেন। তাঁরা ৩০টিরও বেশি দেশের। আরেক সমস্যা মৃতদেহ শনাক্তকরণ। বহু দেহ চেনা যাচ্ছে না। নেপাল পুলিশ ডিএনএ শনাক্তকরণের (DNA identification) জন্য নমুনা নিচ্ছে মৃতদেহ এবং নিখোঁজদের আত্মীয়দের কাছ থেকে। ভারত থেকেও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দল গিয়েছে। স্রোতে ভেসে কিছু দেহ ২৪০ কিলোমিটার দূরে উত্তরপ্রদেশের কুশীনগর ও মহারাজগঞ্জেও পৌঁছেছে।

তুলনার জন্য মনে রাখা ভালো, ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে নেপালে প্রাণ গিয়েছিল প্রায় ৯০০০ মানুষের। ওয়াগলের আশঙ্কা সত্যি হলে এ বারের সংখ্যা তাকেও ছাপিয়ে যাবে।

নিখোঁজদের তালিকায় বাংলা

গিরং বন্দর শুধু বাণিজ্যপথ নয়। এই পথেই নেপাল থেকে তিব্বত হয়ে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় (Kailash Mansarovar Yatra) যান বহু তীর্থযাত্রী। ফলে বিপর্যয়ের ধাক্কা লেগেছে বাংলাতেও।

কলকাতা থেকে একটি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে ২১ আগস্ট রওনা দিয়েছিলেন ৩২ জনের একটি দল। পরদিন তাঁরা পৌঁছন নেপালে। ২৬ আগস্ট, বুধবার সকালে সীমান্ত পেরনোর কথা ছিল। তার আগেই ঘটে যায় ওই বিপর্যয়। তার পর থেকে দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তালিকায় ছিলেন আসানসোল-দুর্গাপুর, বিধাননগর, কলকাতা পুরসভা এলাকা, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিম বর্ধমান ও দার্জিলিংয়ের বাসিন্দারা। চন্দননগর ও বারাসতের কয়েকজনের খোঁজ মিলছে না বলেও খবর ছিল।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) নির্দেশে ভবানীভবনে খোলা হয় বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ। যোগাযোগ রাখা হয় কাঠমাণ্ডুর ভারতীয় দূতাবাস ও নেপালি প্রশাসনের সঙ্গে। বিদেশ মন্ত্রকের হিসাবে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিখোঁজ ভারতীয়ের সংখ্যা ছিল ২৭৫।

হিমালয়ের নদীগুলির এই ঝুঁকি বাংলার কাছে অচেনা নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদ (South Lhonak Lake) ফেটে তিস্তায় নেমেছিল আকস্মিক বান। ধাক্কা লেগেছিল উত্তরবঙ্গেও। হিমবাহী হ্রদ ফেটে বন্যা (Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF) আর এ বারের হিমবাহ ধস যদিও আলাদা ঘটনা বলেই মনে করা হচ্ছে। তবু দু’টিই মনে করিয়ে দেয়, নদীর গতিপথের উপরের অংশের বা উজানের বিপদ নীচের বা ভাটি এলাকায় পৌঁছতে সময় নেয় না।

আলো নিভছে নেপালে

এই প্রবল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (Nepal Electricity Authority) হিসাবে, গ্রিড থেকে প্রায় ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বন্যার জেরে জাস্ট উবে গিয়েছে। নির্মীয়মাণ প্রকল্পের ক্ষতি আরও ৪৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ১৪ মেগাওয়াটের দেবীঘাট (Devighat) কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত।

ঘাটতি মেটাতে ভারতের কাছে আগাম বিদ্যুৎ আমদানির অনুরোধ জানিয়েছিল নেপাল। ভারত তাতে রাজি হয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দৈনিক ১৮ ঘণ্টা ৬৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করবে ভারত।

পুনর্গঠনের খরচে পাশে দিল্লি

নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাবে পুনর্গঠনে (reconstruction) খরচ হতে পারে প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। তিনটি জেলায় সম্পত্তির ক্ষতির আনুমানিক অঙ্ক প্রায় ৪৭৫ কোটি ডলার।

দিল্লি সফরে ওয়াগলে দেখা করেছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের (Nirmala Sitharaman) সঙ্গে। তিনি অনুদান চেয়েছেন। যদিও সহায়তার আর্থিক অঙ্ক জানাননি। খবর, সীতারমন ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তবে বিপর্যয়-পরবর্তী পর্যালোচনার (Post-Disaster Needs Assessment) রিপোর্ট হাতে আসার পরেই  এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন কি দায়ী?

বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে বহুধাবিভক্ত। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বোল্ডার শাখার (University of Colorado Boulder) গবেষক অ্যালটন বায়ার্স (Alton Byers) বলছেন, হাজার হাজার বছর ধরে বরফ আর পাথরকে জুড়ে রেখেছিল চিরতুষার (permafrost)। উষ্ণায়নে সেই বাঁধন আলগা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে (climate change) দায়ী করতে চাননি। তাঁদের মতে, নির্দিষ্ট কারণ আরও খতিয়ে দেখা দরকার। তবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, উষ্ণায়ন এমন বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল (Shisir Khanal) বলেছেন, জলবায়ু সংকটের বোঝা অনেক বেশি বইতে হচ্ছে নেপালকে।

বিপর্যয়ের পরে সমাজমাধ্যমে চিনের বাঁধ বা প্রকল্পকে দায়ী করে গুজব ছড়ায়। উপগ্রহচিত্র ও বিশ্লেষণে অবশ্য উৎস মিলেছে নেপালের দিকের হিমবাহ ধসের।

নেপাল সরকার বিপর্যস্ত এলাকাগুলিকে তিন মাসের জন্য বিপর্যস্ত অঞ্চল ঘোষণা করেছে। তালিকায় নাম যত যাচাই হচ্ছে, সংখ্যাও তত বদলাচ্ছে। প্রতিটি নাম আসলে একেকটি অপেক্ষার গল্প।