পালিয়ে বাঁচতে গিয়ে উত্তাল সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু অন্তত ৫০০ উদ্বাস্তুর, জোড়া নৌকাডুবিতে উদ্বিগ্ন রাষ্ট্রপুঞ্জ

Rohingya Refugee Crisis (Pic: UNICEF/UN0119963/Brown)

জুন মাসের শেষ দিক থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মায়ানমারের (Myanmar) উপকূল ঘেঁষে ডুবে যাওয়া দু’টি নৌকায় ছিলেন পাঁচ শতাধিক মানুষ, যাঁদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা (Rohingya) শরণার্থী। বৃহস্পতিবার জেনিভা থেকে জারি করা এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (International Organization for Migration, IOM) এবং শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR)। যদিও হতাহতের সংখ্যা সরকারিভাবে এখনও নিশ্চিত হয়নি, তবু প্রাথমিক তথ্য বলছে, ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে ভয়াবহ।

দু‘টি নৌকা, দুই ভবিতব্য

রাষ্ট্রপুঞ্জের বিবৃতি অনুযায়ী, নৌকা দু’টি জুন মাসের শেষের দিকে মায়ানমারের অশান্ত রাখাইন রাজ্য (Rakhine State) থেকে রওনা দিয়েছিল। যাত্রীদের একাংশ আবার বাংলাদেশের কক্সবাজারের (Cox’s Bazar) শরণার্থী শিবির থেকেও এসেছিলেন, যেখানে রাখাইন ছেড়ে পালানো ১০ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা অকল্পনীয় খারাপ পরিস্থিতিতে বসবাস করছেন। প্রথম নৌকাটিতে ছিলেন আনুমানিক আড়াইশো জন, যাত্রা শুরুর খানিকক্ষণ পরেই যার সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বিতীয় নৌকাটিতে ছিলেন প্রায় ২৮০ জন, যা গত ৮ জুলাই মায়ানমারের আয়েয়ারওয়াদি (Ayeyarwady) উপকূলে ডুবে গিয়েছে বলে আশঙ্কা।


অসময়ের যাত্রা

স্বাভাবিক সমুদ্রযাত্রার মরসুম না হওয়া সত্ত্বেও কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা, সেই প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সময়ে সমুদ্র সাধারণত অনেক বেশি বিপজ্জনক থাকে, আর সাম্প্রতিক প্রবল বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা সত্যি প্রমাণিত হলে, চলতি বছরে আন্দামান সাগর (Andaman Sea) ও বঙ্গোপসাগরে (Bay of Bengal) নিখোঁজ বা মৃত রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা আরও প্রায় তিনশো বাড়বে বলে জানিয়েছে সংস্থা দু’টি।

বছরভর মৃত্যুমিছিল

রাষ্ট্রপুঞ্জের শরণার্থী সংস্থার তথ্য বলছে, গত বছরই উত্তর ভারত মহাসাগরে সমুদ্রপথে পালাতে গিয়ে নিখোঁজ বা মৃত রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০০। মোট সাড়ে ছ’হাজারেরও বেশি মানুষ এই বিপজ্জনক যাত্রায় সামিল হয়েছিলেন। বিবৃতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মায়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও রোহিঙ্গাদের জন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না থাকাই এই ক্রমবর্ধমান বিপর্যয়ের মূল কারণ। পাচারচক্র (trafficking network) কীভাবে এই মরিয়া মানুষগুলোর অসহায়তাকে কাজে লাগাচ্ছে, সেই প্রসঙ্গও উঠে এসেছে বিবৃতিতে।

বাংলার সীমান্তেও একই সংকট

এই ট্র্যাজেডি নিছক সুদূর মায়ানমার উপকূলের ঘটনা নয়, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও এর যোগ নিবিড়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দীর্ঘতম অংশ, প্রায় ২,২১৬ কিলোমিটার, পড়ে এই রাজ্যেই। মে মাসের বিধানসভা ভোটে ক্ষমতায় আসা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ইতিমধ্যেই ডিটেক্ট-ডিলিট এবং ডিপোর্ট নীতিতে কড়া হাতে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গা শরণার্থী চিহ্নিতকরণে নেমেছে। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় তৈরি হয়েছে হোল্ডিং সেন্টার। ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সীমান্ত ঘেরার কাজেও গতি এসেছে, সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীকে (BSF) জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে দ্রুতগতিতে।

অন্য দিকে বাংলাদেশের তরফে অভিযোগ উঠেছে, প্রথাগত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্তরেখায় মানুষজনকে পুশ-ইন করে দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছেন। ঢাকার তরফে একাধিকবার কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে এই প্রক্রিয়া বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, স্থলপথে কড়াকড়ি যত বাড়ছে, ততই মরিয়া মানুষজন ঝুঁকে পড়ছেন আরও বিপজ্জনক সমুদ্রপথের দিকে, যার ফলেই বারবার ঘটছে এই ধরনের মর্মান্তিক নৌকাডুবি।

আন্তর্জাতিক সাহায্যের আর্জি

রাষ্ট্রপুঞ্জের বিবৃতিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে লক্ষাধিক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ঔদার্যের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলির ধারাবাহিক সহায়তা ছাড়া এবং শরণার্থী সংকটের গোড়ার কারণ সমাধান না করলে এই ধরনের বিপর্যয় বন্ধ করা কঠিন।