খালেদা জিয়া : এক দ্বন্দ্বময় রাজনীতির অবসান

(১৯৪৫–২০২৫­)

সৈয়দ হাসমত জালাল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও উত্তাল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। প্রয়াত হলেন বেগম খালেদা জিয়া— বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপার্সন এবং কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হলো এমন এক রাজনৈতিক যুগ, যেখানে ক্ষমতা ও বিরোধিতা, ব্যক্তিগত শোক ও রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বন্দ্ব একসূত্রে বাঁধা ছিল।

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে জলপাইগুড়িতে। জন্মনাম খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল। পিতা ইসকন্দর আলি মজুমদার ছিলেন চা-ব্যবসায়ী। দেশভাগের ফলে তাঁর পরিবার চলে আসে দিনাজপুরে। আদি নিবাস ছিল ফেনির ফুলগাজি অঞ্চলে, আর মাতৃকুলের শেকড় উত্তর দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাক সেনা আধিকারিক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই ‘পুতুল’ নামটি আড়ালে চলে যায়, পরিচিত হন ‘খালেদা জিয়া’ নামে।


রাজনীতির প্রতি প্রথমদিকে তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল না। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলে তিনি ‘ফার্স্ট লেডি’ হন, কিন্তু ছিলেন অন্তর্মুখী স্বভাবের, জনসম্মুখে আসতে তাঁর তেমন আগ্রহও ছিল না। ১৯৮১ সালে স্বামীর হত্যাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ব্যক্তিগত শোক থেকে জন্ম নেয় রাজনৈতিক প্রত্যয়। ১৯৮২ সালে বিএনপি-র সদস্যপদ গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া, এক বছরের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন।

এরশাদ-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান মুখ। একাধিকবার গৃহবন্দি হয়েও আন্দোলনের পথ ছাড়েননি তিনি। ১৯৯১ সালে সামরিক শাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী দেড় দশকে তিন দফায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন— ১৯৯১ থেকে ৯৬, পরে ১৯৯৬ সালের স্বল্পকালীন দফা এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম শাসনকাল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হয়। নারীশিক্ষা ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও মেরুকরণ ঘটতে থাকে। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে গোটা রাষ্ট্রজীবনকে প্রভাবিত করে। এই দুই নেত্রীর পাল্টাপাল্টি আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন ও সংঘাতময় রাজনীতি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্রমশ চাপের মুখে ফেলে।

২০০১ থেকে ২০০৬, এই সময় খালেদা জিয়ার শেষ দফার প্রধানমন্ত্রিত্ব ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত। তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে উঠেছিল উত্তপ্ত ও অস্থির। বিরোধী দল আওয়ামি লীগের উপর ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার দায় নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় একাধিক প্রাণহানি ঘটে। তদন্তের আঙুল ওঠে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের সহযোগী শক্তির দিকে, যা খালেদা জিয়ার সরকারের উপর গভীর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

এর পাশাপাশি চট্টগ্রামে ট্রাকভর্তি বিপুল অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও সেই সময়ে দেশের রাজনীতিকে নাড়িয়ে দেয়। এই অস্ত্র পাচারের অভিযোগ ওঠে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ মহলের দিকে। আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব ঘটনার অভিঘাত খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

এই সময় থেকেই খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন। অনেকের চোখে তিনি ছিলেন বিএনপি-র ভবিষ্যৎ নেতা, আবার সমালোচকদের মতে তিনি ছিলেন দলীয় ক্ষমতার ছায়া-কেন্দ্র। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগে উঠে আসে তাঁর নাম। ২০০৮ সালে আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর তারেক রহমান দেশ ছেড়ে ব্রিটেনে চলে যান। কার্যত স্বেচ্ছানির্বাসনেই কাটে তাঁর দীর্ঘ সময়।