ইরানের নতুন আয়াতোল্লা আরাফি

আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা   আয়াতোল্লা আলী খামেনির মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর খবরে পশ্চিম এশিয়ায় ডামাডোল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম খামেনির মৃত্যুর খবরে সিলমোহর দিয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে তেহরান। হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ আখ্যা দিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনী।  খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র’ হামলা চালানো হবে বলে তারা দাবি করেছে।

এর আগে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন। পরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজমাধ্যমে একই দাবি করেন। যদিও প্রথমদিকে ইরান সরকার সেই খবর অস্বীকার করে জানায়, তাদের নেতা নিরাপদে আছেন। কিন্তু রবিবার সকালে সরকারি সূত্রেই মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া হয়। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড শোকবার্তায় জানায়, তারা এক অনন্য নেতাকে হারিয়েছে।

হামলার সময় খামেনি নিজের দপ্তরে কাজ করছিলেন। সেই সময় ভয়াবহ বোমা হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের সংবাদমাধ্যম। সরকারি সংবাদসংস্থা জানায়, শনিবার ভোরে এই হামলা চালানো হয়। সে সময় তিনি নিজেরর দপ্তরে কাজ করছিলেন। একই ঘটনায় তাঁর কন্যা, জামাই ও নাতনিও প্রাণ হারিয়েছেন বলে পরিবারের সূত্রে জানা গিয়েছে।


খামেনির মৃত্যুর পর দ্রুত নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা করে তেহরান। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, খামেনির ঘনিষ্ঠ এবং ইরানের অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্ট্‌সের ডেপুটি চেয়ারম্যান আরাফিকে অস্থায়ীভাবে নতুন আয়াতোল্লা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থারও শীর্ষ পদে ছিলেন। খামেনি পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনার মাঝেই এই খবর প্রকাশ্যে এসেছে।

এদিকে খামেনির মৃত্যুর জন্য আমেরিকা ও ইজরায়েলকে দায়ী করে কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রতিশোধ নেওয়াকে ইরান তাদের বৈধ অধিকার ও কর্তব্য হিসেবে দেখছে। তাঁর কথায়, যারা এই ‘ঐতিহাসিক অপরাধ’ ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইরানের দাবি, সাম্প্রতিক হামলায় শুধু খামেনি নন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদা, সেনাপ্রধান আব্দুল রহিম মৌসাভি-সহ একাধিক শীর্ষ সামরিক আধিকারিক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর দেশজুড়ে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ প্রশাসনের সব স্তরকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এছাড়া ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারজানি আমেরিকা ও ইজরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ইরানের পাল্টা আঘাত হবে নজিরবিহীন। লারজানির এই মন্তব্যের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ইরান আরও হামলা চালালে আমেরিকাও কঠোর জবাব দেবে।

আয়াতোল্লা আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চিন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার তীব্র নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে চিনের বিদেশ মন্ত্রক। বেজিং অবিলম্বে সংঘর্ষবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সংযম দেখানো জরুরি এবং আলোচনার মাধ্যমেই উত্তেজনার সমাধান সম্ভব।

রবিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে চিন উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, একটি সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ডে এই ধরনের সামরিক অভিযান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক। তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করা উচিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নীতিকে ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়েছে বেজিং। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমও একই সুরে বলেছে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদের পরিপন্থী।

পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ইজরায়েল ও ইরানে থাকা চিনা নাগরিকদের দ্রুত সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইজরায়েলে অবস্থিত চিনা দূতাবাস জানিয়েছে, টাবা সীমান্ত পেরিয়ে নাগরিকদের মিশরে চলে যেতে হবে। ইরানে অবস্থানরতদেরও যত দ্রুত সম্ভব দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে। বিমান পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, তুরস্ক ও ইরাক হয়ে স্থলপথে বেরিয়ে যাওয়ার বিকল্প রুটের কথা জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে খামেনির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। খামেনির হত্যাকাণ্ডকে মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সব নীতির নিষ্ঠুর লঙ্ঘন বলে উল্লেখে করেছেন তিনি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও খামেনির পরিবারের সদস্যদের প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন শোকপ্রকাশ করেছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আজ রোববার এ তথ্য জানান।রুশ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, রাশিয়ায় খামেনিকে একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণ করা হবে, যিনি রাশিয়া ও ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে  উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।

আয়াতোল্লা আলী খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তেহরান আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করার পর ইরানের বিভিন্ন শহরে মানুষ রাস্তায় নেমে শোক প্রকাশ করেন। কোম ও ইয়াসুজে বহু মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে সমবেত হন।

অন্যদিকে, আমেরিকায় বসবাসকারী কিছু ইরানি নাগরিক ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানান। লস অ্যাঞ্জেলসে, যেখানে বৃহৎ ইরানি সম্প্রদায় রয়েছে, সেখানে অনেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। আমেরিকা ও ইরানের পতাকা হাতে তাঁদের ‘মেক ইরান গ্রেট এগেন’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। একই সময়ে হোয়াইট হাউস ও টাইমস স্কোয়ারের বাইরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সামরিক নীতির বিরোধিতায় বিক্ষোভ হয়।

সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির মৃত্যুতে ইরানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। একাংশ শোকাহত হলেও অন্য অংশ স্বস্তি প্রকাশ করেছে। গত ডিসেম্বর মাসে তাঁর সরকারের কড়াকড়ি অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল, যা পরে প্রশাসনবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।