ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অস্বস্তি আরও তীব্র আকার নিল। একদিকে বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্য সমর্থনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লাগাতার মন্তব্য, অন্যদিকে তার পালটা কড়া প্রতিক্রিয়ায় সরব তেহরান—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ নেতা ও প্রাক্তন পার্লামেন্ট স্পিকার আলি লারিজানি প্রকাশ্যে ট্রাম্প ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ইরানিদের ‘প্রধান হত্যাকারী’ বলে আক্রমণ করেছেন।
মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে গত ২৭ ডিসেম্বর তেহরানে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রথমে দোকানদারদের আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। সরকারবিরোধী স্লোগানের পাশাপাশি রাজপথে শোনা যেতে থাকে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধেও সরাসরি ক্ষোভ। প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একের পর এক স্লোগান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে ইরান সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর দাবি, তেহরান আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে কোনও ধরনের আলোচনায় বসতে রাজি নয় ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সব রকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ট্রাম্পের এই অবস্থানে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে আলি লারিজানি বলেন, ‘ইরানের জনগণের প্রধান হত্যাকারীদের নাম আমরা প্রকাশ করছি।’ সেই তালিকায় প্রথমেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পর বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নাম উল্লেখ করেন তিনি। লারিজানির অভিযোগ, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার নেপথ্যে আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে।
এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক স্তরেও তুলে ধরেছে তেহরান। রাষ্ট্রপুঞ্জে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সৈয়দ ইরাভানি নিরাপত্তা পরিষদকে লেখা এক চিঠিতে দাবি করেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ও অবস্থান ইরানে হিংসা উসকে দিচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, ইরানের তরুণ প্রজন্ম-সহ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল দায়ী।
এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অন্দরমহলে সম্ভাব্য কঠোর কূটনৈতিক ও সামরিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারির সুরে জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যদি ফাঁসি বা চরম দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে আমেরিকা ‘খুব কঠোর জবাব’ দেবে। সব মিলিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট ঘিরে এই ত্রিমুখী টানাপোড়েন যে আরও তীব্র হতে চলেছে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।