দেশজুড়ে গণ বিক্ষোভ দমন করতে আবারও কঠোরতম পথ বেছে নিল ইরান। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ২৬ বছরের এক যুবককে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থাগুলির দাবি, বুধবারই ওই সাজা কার্যকর হতে চলেছে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ইরানের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
খামেনেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুবকের নাম এরফান সোলতানি। সাজাপ্রাপ্ত ওই যুবক রাজধানী তেহরান সংলগ্ন একটি মফস্সল এলাকার বাসিন্দা। অভিযোগ, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার জন্য গত ৮ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের পর থেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর গত রবিবার পরিবারের হাতে পৌঁছয় মৃত্যুদণ্ডের নোটিস।
ডিসেম্বরের শেষে ইরানে গণবিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কোনও বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার খবর সামনে এল। উল্লেখ্য, কয়েক দিন আগেই ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে চরম শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তার পরদিনই সুর বদলে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে সেই আশ্বাসের কোনও প্রতিফলন ঘটেনি বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, এরফান সোলতানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম আইনি প্রক্রিয়াও মানা হয়নি। তাঁকে আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি, পরিবার থেকে মামলার তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। দ্রুত বিচারের নামে রুদ্ধদ্বার প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইরানে বিরুদ্ধমত দমনে মৃত্যুদণ্ড নতুন ঘটনা নয়। অতীতেও আন্দোলনকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুলি চালিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত। এ বার প্রকাশ্যে ফাঁসির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর কৌশল বলেই মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিক্ষোভের রূপ নেয়। খামেনেইয়ের অপসারণের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। তেহরানের পাশাপাশি একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলনের আগুন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিচালনার অভিযোগও উঠেছে। আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বিক্ষোভে এখনও পর্যন্ত ৬০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ আহতদের ভিড় উপচে পড়ছে।
ফলে এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।