হাইজ্যাকের চেষ্টা রুখে বীরত্বের স্বীকৃতি, UAE-র সম্মান পেলেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছর

ইজরায়েলগামী বিমানে সহ-পাইলটের হামলা ও ছিনতাইয়ের চেষ্টা রুখে ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) বিশেষ সম্মান পেলেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছর। বুধবার UAE-র প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের হাত থেকে ‘ফার্স্ট ক্লাস অর্ডার অফ জায়েদ II’ সম্মান গ্রহণ করেন তিনি। তবে সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে সবার নজর কেড়েছে তাঁর মাথার পিছনে অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ সেলাইয়ের দাগ এবং হাতের স্লিং। ভয়াবহ হামলায় কতটা গুরুতর আহত হয়েছিলেন এই ভারতীয় পাইলট, তা প্রথমবার প্রকাশ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে ঘটনাটি ঘটে। বিমানটি যখন ইজরায়েলের আকাশসীমার দিকে এগোচ্ছিল, তখন ককপিটের ভিতরে স্মিত মচ্ছরের উপর হামলা চালান তাঁর ওমানি সহ-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি। অভিযোগ, একটি ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে পিছন থেকে আঘাত করে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এমনকী, তেল আভিভের কোনও বহুতলে বিমানটি আছড়ে ফেলে ৯/১১-র মতো হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল বলেও প্রাথমিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

গুরুতর আঘাত নিয়েও যাত্রীদের বাঁচাতে লড়াই

মাথায় গুরুতর আঘাত এবং দ্রুত রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও হাল ছাড়েননি ৩৮ বছর বয়সি ভারতীয় পাইলট। প্রবল যন্ত্রণার মধ্যেও ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন তিনি। এরপর বিমানের অন্য কর্মী ও যাত্রীরা ভিতরে ঢুকে অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে কাবু করেন।


এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে মাত্র দু’মিনিটে বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতা হারিয়ে ফেলে। পরে বিমানে থাকা দুই অফ-ডিউটি পাইলটের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিমানটিকে স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়।

এই ঘটনায় স্মিতের মাথার খুলি ভেঙে যায়। তাঁর হাতে-সহ শরীরের একাধিক জায়গায় আঘাত লাগে। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর মাথায় ‘ডিপ্রেসড স্কাল ফ্র্যাকচার’ হয়েছিল। এই ধরনের চোটে খুলির ভাঙা হাড়ের একটি অংশ ভিতরের দিকে ঢুকে যায়, যা মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

প্রথমে সৌদি আরবে তাঁর জরুরি চিকিৎসা করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মাথার খুলির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠন করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে UAE-তে নিয়ে যাওয়া হয়। মাথা ও হাতের আঘাত ছাড়াও তাঁর হাত-পায়ে ছুরির ক্ষত এবং বুক ও পেটের উপরের অংশে চোট লেগেছিল বলে জানা গিয়েছে।

‘সেরে উঠলে আপনাকে জিউ-জিৎসু শেখাব’, পাইলটকে বললেন UAE প্রেসিডেন্ট

সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে স্মিতের সঙ্গে UAE প্রেসিডেন্টের কথোপকথনের একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট তাঁর মাথার সেলাইয়ের দাগ এবং হাতের স্লিংয়ের দিকে নজর দিচ্ছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজও নেন তিনি।

স্মিত কবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন, তা জানতে চান UAE প্রেসিডেন্ট। উত্তরে ভারতীয় পাইলট জানান, সুস্থ হতে হয়তো আরও দু’মাস সময় লাগতে পারে।

এরপর শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ মজার ছলে বলেন, “আপনি সুস্থ হয়ে উঠলে আমি আপনার সঙ্গে একটি সেশন করতে চাই। আপনাকে লড়াই করতে শেখাব—একটি জিউ-জিৎসু সেশন।”

প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যে হেসে ফেলেন স্মিত। তিনি বলেন, “এটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় সম্মান।” এরপর দু’জনকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করতেও দেখা যায়।

উল্লেখ্য, জিউ-জিৎসু UAE-তে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মার্শাল আর্ট। বিশেষ করে আবু ধাবি এই খেলার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রগুলির অন্যতম। ফলে পাইলটকে এই মার্শাল আর্ট শেখানোর প্রস্তাব দিয়ে প্রেসিডেন্টের রসিকতা অনুষ্ঠানে এক আন্তরিক মুহূর্ত তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত ভারতীয় পাইলট

স্মিতের মাথার আঘাতের একটি ক্লোজ-আপ ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেন ব্রিটেনের কট্টর ডানপন্থী নেতা টমি রবিনসন। ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, “সব নায়ক কেপ পরেন না। কেউ কেউ যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন বহন করেন।” একই সঙ্গে ভারতীয় পাইলটের সাহসিকতার প্রশংসা করেন তিনি।

সম্মানের তালিকায় আরও সংযোজন

UAE-র এই সম্মান স্মিত মচ্ছরের বীরত্বের স্বীকৃতির তালিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এর আগে গুজরাত সরকার তাঁকে ‘বিশিষ্ট গুজরাত গরিমা’ সম্মানে ভূষিত করেছে। অন্যদিকে, ইজরায়েল সরকারও তাঁকে বেসামরিক বীরত্বের জন্য প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া, গত সপ্তাহে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্মিত মচ্ছরকে ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মশাল প্রজ্বালনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

ভয়াবহ হামলার মুখেও উপস্থিত বুদ্ধি, সাহস এবং দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন স্মিত মচ্ছর। তাঁর এই সাহসিকতা এখন আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হচ্ছে।