পোল্যান্ডে সরকার-বিচার বিভাগ সংঘাত চরমে, মাঝআকাশ থেকে দেশে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট

Photo: Statesman

পোল্যান্ডে সরকার ও বিচার বিভাগের সংঘাত এবার চরমে। সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে এক মাসের জন্য দায়িত্ব থেকে সরানোর নির্দেশ দিলেন আদালতেরই এক বিচারপতি। আর সেই সিদ্ধান্ত ঘিরেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করলেন বিরোধী দল ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস’ বা পিআইএসের সমর্থকরা। পরিস্থিতির খবর পেয়ে সেনেগাল সফরে যাওয়ার পথে মাঝ-আকাশ থেকেই বিমান ঘুরিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি।

ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ। পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আদালতের প্রেসিডেন্ট বোগদান শভিয়েচকোভস্কি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট বার্তলোমেই সোচানস্কিকে এক মাসের জন্য দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী বিচারপতি আনা কোরউইন-পিওত্রোভস্কা এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তাঁর বক্তব্য, দেশে আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। ওই সময়ের জন্য ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বও নিজের হাতে নেওয়ার কথা জানান তিনি। তবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই আদালতের ওয়েবসাইট অকেজো হয়ে যায়।

এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পথে নামেন প্রধান বিরোধী দল পিআইএসের সমর্থকরা। আদালত চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন তাঁরা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের নেতৃত্বাধীন ইউরোপপন্থী সরকার অন্যায়ভাবে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আদালত চত্বরে মোতায়েন করা হয় দাঙ্গা-পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ভবনে ঢুকতে বাধা দিতে ঘিরে ফেলা হয় গোটা এলাকা।


পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকজন বিক্ষোভকারী আদালতের বেড়া ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন এবং আধিকারিকদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। ঘটনায় ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনালের আনুষ্ঠানিক সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টে আনা কোরউইন-পিওত্রোভস্কার সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে দাবি করা হয়। বরখাস্তের নির্দেশ খারিজ করে জানানো হয়, শভিয়েচকোভস্কিই বৈধভাবে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল রয়েছেন। এর পাশাপাশি, এই ঘটনাকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ।

প্রধানমন্ত্রী টাস্ক অবশ্য আনার সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, আইনের শাসন পুনরুদ্ধার করা সরকারের দায়িত্ব। এই প্রক্রিয়া কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। এদিকে, শুক্রবার সেনেগাল সফরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি। কিন্তু দেশে অশান্তির খবর পেয়ে স্পেনের আকাশ থেকে বিমান ঘুরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সমাজমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘এমন মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের পোল্যান্ডে থাকা প্রয়োজন। আমি সেনেগাল সফর সংক্ষিপ্ত করছি। ফিরে আসছি।’ উল্লেখ্য, পোল্যান্ডের এই সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় টানাপোড়েন। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা পিআইএস সরকারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠেছিল। সেই সময়েই শভিয়েচকোভস্কি সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান হন।

২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী টাস্ক বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নিযুক্ত বিচারপতিদের নিয়ে তৈরি বিতর্কের অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কি ও পিআইএসের ঘনিষ্ঠতা এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে প্রেসিডেন্টের আপত্তির জেরে সংঘাত আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন: ইরান-মার্কিন শান্তি খসড়ায় ৭ দিনের মধ্যে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, ফের হরমুজ চালুর প্রস্তাব

সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহকারীর সাংবিধানিক রক্ষাকবচ প্রত্যাহারের অনুমতি চেয়ে আবেদনও জমা পড়েছিল। তারপরেই শুক্রবারের এই ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করল। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় পোল্যান্ডের সাংবিধানিক সঙ্কট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।