ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলা, বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা

ইরানকে লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল যৌথভাবে ব্যাপক সামরিক হামলা চালানোর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড়সড় বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে বড় বাধা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করাই এই সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর ফলে এই অঞ্চলে তেলের পরিবহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলার ফলে তেলের দামে ‘যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত মূল্য’ যোগ হতে পারে। কারণ, ইরানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ শুরু করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সেজন্য তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭২.৪৮ ডলারে পৌঁছেছে।


আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক বার্কলেস ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে উত্তেজনার কারণে ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে, যা দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি দপ্তরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক। গত কয়েক বছরে ভারত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অন্যান্য দেশ থেকেও তেল আমদানি বাড়িয়েছে। ফলে এখন দেশের বড় অংশের তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল নয়।

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ইতিমধ্যেই কয়েক সপ্তাহের জন্য পর্যাপ্ত তেলের মজুত রেখেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন কৌশলগত মজুত কেন্দ্রেও বিপুল পরিমাণ তেল সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে ভারতের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং মুদ্রাস্ফীতির উপর চাপ পড়ে। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত বিশাখাপত্তনম, মঙ্গলুরু এবং পুদুরে কৌশলগত তেল মজুত কেন্দ্র তৈরি করেছে। এছাড়া ওড়িশার চাঁদিখোলে আরও একটি নতুন সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে এই মজুত থেকে তেল ব্যবহার করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্র সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতির উপর তার বড় প্রভাব পড়বে। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে পরিবহণ ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।