হিমবাহ-ধস থেকে নেমে আসা হড়পা বানের তাণ্ডবে শুধু নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা নয়, প্রশ্নের মুখে পড়েছে চিনের একাধিক পরিকাঠামো প্রকল্পও। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরং স্থলবন্দর কার্যত ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। কাদামাটির স্রোতে ভেসেছে সীমান্তের একাধিক রাস্তা ও সেতু। ফলে হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় স্থায়ী নির্মাণ এবং চিনের প্রস্তাবিত কাঠমান্ডু-তিব্বত রেলপথের বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব তা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় রেল ও সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় চিন। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই। এর আওতায় তিব্বত থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুকে রেলপথে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকল্পটির কথা ঘোষণা করা হলেও এখনও তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছয়নি। হিমালয় কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি, একাধিক সেতু নির্মাণ এবং অত্যন্ত দুর্গম ভূখণ্ডের মধ্যে দিয়ে রেললাইন বসানোর মতো কাজ কতটা নিরাপদ ও টেকসই হবে, ২৬ আগস্টের বিপর্যয়ের পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
চিন-নেপাল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ গিরং স্থলবন্দর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। বিপর্যয়ের প্রায় ১০ দিন পরেও বন্দর-সংলগ্ন এলাকা পুরু কাদার স্তরে ঢাকা। সরকারিভাবে চিন এই এলাকার সঙ্গে প্রস্তাবিত রেলপথের যোগসূত্র স্পষ্ট করেনি। তবে এর আশপাশ দিয়েই তিব্বত-কাঠমান্ডু রেলপথ যাওয়ার কথা ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
শুধু রেলপথ নয়, চিনের ব্রহ্মপুত্র নদে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ তৈরির পরিকল্পনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিব্বতের নামচা বারওয়া এলাকায়, ব্রহ্মপুত্র ভারতে প্রবেশের ঠিক আগে এই প্রকল্প তৈরির কথা জানিয়েছে বেজিং। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প ভাটির দেশগুলিতে জলপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয় অঞ্চলে জল, হিমবাহ এবং ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে কত দ্রুত ছড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় নেপাল, ভারত ও চিনের মধ্যে জলবায়ু এবং জলপ্রবাহ সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত আদানপ্রদান জরুরি। কোথায় কত জল জমছে, কখন জল ছাড়া হচ্ছে কিংবা হিমবাহ হ্রদের পরিস্থিতি কী—এই তথ্য গোপন রাখা হলে দেশগুলির বিপদ বাড়তে পারে। চিনের বিরুদ্ধে অতীতে জলসংক্রান্ত তথ্য যথেষ্ট ভাগ না করার অভিযোগও উঠেছে।
আরও পড়ুন: যুদ্ধের খরচ তুলতে পর্ন ইন্ডাস্ট্রিকে বৈধ করার পথে ইউক্রেন
এই বিপর্যয়ের পর নেপালও হিমবাহ হ্রদ নিয়ে নতুন করে সতর্ক হয়েছে। জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ এবং ইউএনডিপি মিলে চারটি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের জলস্তর কমানোর পরিকল্পনা করেছে। ‘গ্লফ সঞ্জীবনী’ প্রকল্পে কয়েকটি হ্রদের জলস্তর কমানো হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ৫ কোটি ডলার। প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষ এর ফলে উপকৃত হতে পারেন বলে জানিয়েছে নেপাল সরকার।