ফ্রান্সে বিক্ষোভের আগুন, পুড়ে ছাই ১৪০ বছরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হল! গ্রেপ্তার ১২০০, আহত ১৫০ পুলিশকর্মী

শিক্ষাক্ষেত্রে পরিকাঠামোর দুরবস্থা, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি-সহ একাধিক ইস্যুতে উত্তাল ফ্রান্স। প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমে হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, বিক্ষোভের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে লিমোজ শহরের ১৪০ বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্যবাহী টাউন হল। দুই বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী ঐতিহাসিক ভবনটি এবার মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের অগ্নিসংযোগে কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বলে খবর। আগুন লাগানোর আগে সেখানে লুটপাটও চালানো হয় বলে অভিযোগ। বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারীর তাণ্ডব সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ, রণক্ষেত্র একাধিক শহর

গত এক সপ্তাহ ধরে ছাত্র ও শ্রমিকদের বিক্ষোভে কার্যত অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে। রাজধানী প্যারিস-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে মূল্যবৃদ্ধি এবং একাধিক সরকারি নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন হাজার হাজার মানুষ। প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণভাবে চলা মিছিল ঘিরে ক্রমে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি গড়ায় ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু শনিবার রাতে জানান, হিংসার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়ে আহত হয়েছেন ১৫০ জন পুলিশকর্মী।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ। যদিও আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিক ইউনিয়ন CGT-র দাবি, দেশজুড়ে রাস্তায় নেমেছিলেন ৮ লক্ষের বেশি মানুষ।


 

কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, পালটা ইটবৃষ্টি

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। পালটা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল এবং হাতের কাছে থাকা বিভিন্ন জিনিস ছুড়তে শুরু করেন বিক্ষোভকারীদের একাংশ। কোথাও কোথাও আতসবাজিও ছোড়া হয় বলে অভিযোগ।

দক্ষিণ ফ্রান্সের সাঁ-এতিয়েন শহরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সেখানে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরের ডান হাত উড়ে যায় বলে জানা গিয়েছে।

প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গ-সহ একাধিক শহরে দোকানপাটে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। সুপারমার্কেট, ফার্মেসি, পোশাকের শোরুম, চশমার দোকান, ইলেকট্রনিক্সের বিপণি এবং বিলাসবহুল পণ্যের দোকানও হামলার নিশানায় এসেছে বলে খবর।

 

 

 

 

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

দেশজুড়ে এই অস্থিরতার জেরে ফ্রান্সের শাসক শিবিরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা পরিকাঠামোর সমস্যা এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ এখন রাস্তায় বিস্ফোরক চেহারা নিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের উদ্বেগ বাড়ছে। নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু হলেও চলমান বিক্ষোভ রাজনৈতিক সমীকরণে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার লড়াইও এই পরিস্থিতিতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তবে বিক্ষোভের প্রকৃত কারণ, আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন দাবির গুরুত্ব এবং হিংসার ঘটনায় কারা জড়িত, তা পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। একদিকে জনতার ক্ষোভ, অন্যদিকে ঐতিহাসিক সম্পত্তি ধ্বংস ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে গভীর সংকটের মুখে ফ্রান্স।