দেশ শেষ হয়ে যাচ্ছে, উর্দি খুলে ফেলুন: পাকিস্তানেই বেনজির কোণঠাসা সেনাপ্রধান আসিম মুনীর

প্রবল চাপে মুনীর (Stock Image)

পাকিস্তানে (Pakistan) সেনা ও রাজনীতির সংঘাত ফের প্রকাশ্যে। পঞ্জাব প্রদেশের এক জনসভা থেকে দেশের প্রভাবশালী বিরোধী নেতা মৌলানা ফজলুর রহমান সরাসরি নিশানা করলেন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনীরকে (Asim Munir)। জমিয়ত উলেমা-ই-ইসলাম-ফজল বা জেইউআই-এফ (JUI-F)-এর এই প্রধানের চ্যালেঞ্জ, রাজনীতি করতে চাইলে উর্দি খুলে সরাসরি ভোটের ময়দানে নামুন সেনাপ্রধান। তাঁর কথায়, নিজের দল তৈরি করে নির্বাচনে লড়াই করলেই বোঝা যাবে উর্দি পরা মানুষ ঠিক কত ভোট পান।

সরকার গড়া বা ভাঙার অধিকার

মৌলানার প্রশ্ন, সরকার গঠন করা বা কাউকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত কি সেনাবাহিনীর ইচ্ছাধীন হতে পারে। সেনার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে তাঁর তীব্র কটাক্ষ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের রায়ই শেষ কথা হওয়া উচিত। প্রশাসনিক কৌশলে তৈরি করা জনাদেশ নয়। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে কিংমেকারের ভূমিকা পালন করে আসা এই নেতাকে বিরোধীরা কখনও কখনও ‘মৌলানা ডিজেল’ নামেও কটাক্ষ করে থাকেন, যদিও ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর প্রভাব সময়ে সময়ে প্রায় প্রশ্নাতীত হয়ে দাঁড়ায়।


বালোচিস্তান নিয়ে ভয়ঙ্কর দাবি

মৌলানা ফজলুর রহমানের অভিযোগ, বালোচিস্তানের (Balochistan) বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। তাঁর ভাষায়, বালোচ অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বেগ ছিলই, এখন পাখতুন (Pashtun) অধ্যুষিত এলাকাতেও রক্তের বন্যা বইছে। মাত্র দু’-তিন দিনের মধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি মৃতদেহের খোঁজ পাওয়ার দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, বাজারে গিয়ে শুধু কাফনের কাপড় কেনাই খালি বাকি আছে পরিবারগুলির। সেনার বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষকে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়তে বলা হচ্ছে, অথচ দায়িত্ব ও বেতন দুটোই সেনার হাতে।

সন্ত্রাসের পরিসংখ্যান

সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের (South Asia Terrorism Portal) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত পাকিস্তানে সন্ত্রাসের ঘটনায় প্রায় সাড়ে চারশো সাধারণ নাগরিক এবং সাতশোরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। নিহত সন্ত্রাসবাদীদের সংখ্যাও প্রায় বারোশো। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (TTP) ‘অপারেশন খাইবার’-এর আওতায় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে একের পর এক সমন্বিত হামলার খবরও সামনে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সম্প্রতি সেনাপ্রধান মুনীর ও বালোচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতির সঙ্গে বৈঠকও করেছেন, যেখানে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে জঙ্গিহানার অভিযোগ তোলা হয়।

পাক অধিকৃত কাশ্মীরেও অশান্তি

উত্তেজনা ছড়িয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরেও (Pakistan-occupied Kashmir, PoK)। মৌলিক অধিকার, মূল্যবৃ্দ্ধি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে সেখানে বিক্ষোভ চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। বাঘ আরজা জান্দালা এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলি চালানোর অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি যৌথ পদক্ষেপ কমিটি (JAAC)-র ডাকে মুজফফরাবাদ অভিমুখে লংমার্চ অভিযান ঘিরে ব্যাপক অশান্তি ছড়িয়েছে। দফায় দফায় সংঘর্ষে কমপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। কাঠগড়ায় উঠেছে সেনার ভূমিকা।

সেনার নজরে মৌলানা

মৌলানা ফজলুর রহমানের অভিযোগ, তাঁর গতিবিধির উপরেও কড়া নজর রাখছে সেনা। চিঠি দিয়ে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও চাপানো হয়েছে বলে তাঁর দাবি। এমনকী তাঁর কোনও ক্ষতি হলে তার দায় সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উপরেই বর্তাবে বলেও সতর্ক করেছেন প্রবীণ এই রাজনীতিক।

ভারতের অবস্থান

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ এই টানাপোড়েন নিছক প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপরেও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল। সীমান্তের ওপারে সেনা-রাজনীতি সংঘাত ও ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার দিকে অতএব কড়া নজর রাখছে নয়াদিল্লি। কারণ পশ্চিম সীমান্তের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে গোটা উপমহাদেশের নিরাপত্তা সমীকরণকেই প্রভাবিত করতে পারে।