এক ধাক্কায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই মেটার, ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’- সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জুকারবার্গের

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থা মেটা প্ল্যাটফর্মস্ এক ধাক্কায় প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা মোট কর্মীসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি দুনিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সংস্থার দাবি, এটি বৃহৎ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ, যার লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কেন্দ্রিক নতুন পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো। সংস্থার সিইও মার্ক জুকারবার্গ জানিয়েছেন, মেটার বৃহৎ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ভবিষ্যতের এআই-নির্ভর প্রযুক্তি পরিকাঠামো গড়ে তুলতে এবং সংস্থার কার্যকারিতা বাড়াতেই এই পদক্ষেপ। 

বৃহস্পতিবার জুকারবার্গ এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘আমরা জানি এটি খুব কঠিন সিদ্ধান্ত।’ তবে কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, মানবিক সংবেদনশীলতার সম্পূর্ণ অভাব ছিল গোটা ছাঁটাই প্রক্রিয়ায়। ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ সপ্তাহের বেসিক বেতন এবং প্রতি বছরের চাকরির জন্য অতিরিক্ত ২ সপ্তাহের বেতন দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৮ মাস পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিমার সুবিধাও দেওয়া হবে। অন্যান্য দেশের স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী একই ধরনের প্যাকেজ দেওয়া হবে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের ভোররাতে একটি ই-মেল পাঠানো হয়, যেখানে জানানো হয়, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপনার পদটি আর সংস্থার পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় নয়।’ ই-মেলে আরও বলা হয়, যাঁরা সেই মুহূর্তে অফিসে ছিলেন তাঁরা যেন ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। ই-মেলের এই ভাষা ও সময় নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেক কর্মীই বাড়ি থেকে কাজ করছিলেন। ফলে এমন নির্দেশিকা ‘অবমাননাকর’ বলে দাবি করা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, ই-মেলটি পাঠানো হয়েছিল সিঙ্গাপুর দপ্তর থেকে ভোর প্রায় চারটের সময়।


এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি শিল্পে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক এবং নতুন করে উদ্বেগে পড়েছেন বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসাগ্রহণকারী ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীরা।আমেরিকার অভিবাসন আইনে এইচ-১বি ভিসা সরাসরি চাকরির সঙ্গে যুক্ত। ফলে চাকরি চলে গেলে নতুন স্পনসর খুঁজে পাওয়ার জন্য সাধারণত মাত্র ৬০ দিনের সময় পান কর্মীরা। সেই সময়ের মধ্যে নতুন চাকরি না পেলে দেশ ছাড়তে হতে পারে।  

বর্তমানে বহু ভারতীয় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন। কারও পরিবার আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, কেউ বাড়ি কিনেছেন, কারও সন্তান সেখানেই জন্মেছে। ফলে চাকরি হারানোর পরে শুধু কর্মজীবন নয়, গোটা জীবনযাত্রাই অনিশ্চয়তার মুখে। কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বহু ভারতীয় কর্মী এখন অস্থায়ীভাবে বি-২ ভিজিটর ভিসায় পরিবর্তনের কথা ভাবছেন, যাতে আরও কিছু সময় আমেরিকায় থেকে নতুন চাকরি খোঁজা যায়।

সংস্থার চিফ পিপল অফিসার বা প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা জ্যানেল গেল জানিয়েছেন, ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের জায়গায় নতুন করে এআই-কেন্দ্রিক টিম গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার শূন্য পদও স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রোডাক্ট টিমগুলিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি কিছু কর্মীকে নতুন বিভাগে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে, যেখানে মূল ফোকাস থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রকল্পের উপর।

সংস্থার মোট কর্মীসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮ হাজার। এই ছাঁটাই ও পুনর্বিন্যাসের ফলে সংগঠনের ভিতরের ম্যানেজমেন্টের স্তর বা ধাপ কমিয়ে ফেলা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। মেটা ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তারা চলতি বছরে বিপুল পরিমাণ অর্থ—প্রায় ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, যার বড় অংশ যাবে এআই পরিকাঠামো, ডেটা সেন্টার ও মেমরি ইনফ্রাস্ট্রাকচারে।

সংস্থার অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, ভবিষ্যতে আরও কর্মী ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এআই-নির্ভর কর্মপদ্ধতির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে মেটা। অতীতেও ২০২২–২৩ সালে বড় আকারে ছাঁটাই করেছে সংস্থাটি। চলতি বছরেই সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় এক লক্ষেরও বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে অরাকল্ কর্পোরেশনও বড় আকারে কর্মী ছাঁটাই করেছিল। সামগ্রিকভাবে প্রযুক্তি শিল্পে নিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন চাকরি পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে অনেক ভারতীয় পেশাজীবী এখন কানাডা, ইউরোপ কিংবা ভারতে ফিরে আসার বিকল্প ভাবতে শুরু করেছেন।