নাহিদের হুমকিতে পিছু হটল নির্বাচন কমিশন, ভোটকেন্দ্রে নেওয়া যাবে মোবাইল ফোন

ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ধোঁয়াশার অবসান, অবস্থান স্পষ্ট করল নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মুঠোফোন বহন নিষিদ্ধ— এই ঘোষণা ঘিরে যে তীব্র বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটাতে বাধ্য হল বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। সোমবার সন্ধ্যায় কমিশনের সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, ভোটার, প্রার্থী এবং তাঁদের এজেন্টরা মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়েই ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে পারবেন। তবে গোপন কক্ষে কোনোভাবেই ছবি তোলা যাবে না।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে সন্ধ্যায় আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইসি সচিব কার্যত স্বীকার করে নেন, আগের বিজ্ঞপ্তির ভাষা বিভ্রান্তিকর ছিল। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন আসলে যা বোঝাতে চেয়েছিল, সেটা ঠিকভাবে বোঝাতে পারেনি। সেখান থেকেই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। সেই কারণেই আমরা পরিপত্র সংশোধন করছি, যাতে কোনও দ্বিধা বা বিভ্রান্তি না থাকে।”

গত রবিবার নির্বাচন কমিশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে মুঠোফোন নিয়ে যাওয়া যাবে না। এই ঘোষণার পরই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের এজেন্ট ও পর্যবেক্ষকদের কাজকর্ম নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ভোটের স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকেই।


এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দেন— সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে নির্দেশ প্রত্যাহার না হলে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের দফতর ঘেরাও করা হবে। ঢাকার মহম্মদপুরে এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে নাহিদ বলেন, “কার পরিকল্পনা অনুযায়ী কমিশন কাজ করছে, তা এখন জনগণের কাছে পরিষ্কার।” ওই সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও শীর্ষ নেতা শফিকুর রহমান। নাহিদ আরও বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যদি কোনও পক্ষপাতিত্ব করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে তার পরিণতি ফ্যাসিস্ট আমলের থেকেও ভয়াবহ হবে।”

এই রাজনৈতিক চাপ ও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া সমালোচনার মধ্যেই সোমবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থান পরিষ্কার করল। ইসি সচিব জানান, ভোটার, প্রার্থী ও তাঁদের এজেন্টরা মোবাইল নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে পোলিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং এজেন্টদের কাছে মোবাইল ফোন রাখা যাবে না। কেন এই ক্ষেত্রে আলাদা বিধিনিষেধ, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিলেও কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।

সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা থাকবে না বলে স্পষ্ট করেছেন ইসি সচিব। তিনি বলেন, “সংবাদকর্মী বা পর্যবেক্ষকেরা মোবাইল নিয়ে ভেতরে যেতে পারবেন—এই বিষয়টি আমি নিশ্চিত করছি।” তিনি আরও জানান, নির্বাচন–সংক্রান্ত কাজে ইতিমধ্যেই দেশে ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক এসেছেন। এর মধ্যে ৬০ জন এসেছেন বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, ৩৩০ জন এসেছেন আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে এবং প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিক এসেছেন ৪৫টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তরফে। আপাতত তাঁরা রাজধানীর একটি হোটেলে অবস্থান করছেন।

ভোট গণনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, ফলাফল ঘোষণায় অযথা দেরি হওয়ার কোনও কারণ নেই। তাঁর কথায়, “যতগুলো ব্যালটে ভোট গ্রহণ হবে, সেগুলোর গণনা শেষ করতে যে সময় লাগে, সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে তিন দিন বা পাঁচ দিন ধরে ভোট গণনা চলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে না।”
সব মিলিয়ে, মোবাইল নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তাপ ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা কাটাতে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত পিছু হটল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। যদিও ভোটের দিন বাস্তবে এই সংশোধিত নির্দেশ কতটা মসৃণভাবে কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।