৪০০০ মৃত্যু, হাতে নেই ভ্যাকসিন: মারণ ভাইরাসের ঢেউ আছড়ে পড়েছে, দুয়ারে আরেকটা অতিমারী

Congo's Ebola outbreak has recorded over 4,000 deaths as authorities struggle to contain the virus (Image: Pexels/@Fahrettin Turgut)

এবোলা (Ebola) সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছে ৪০০০। সরকারি সর্বশেষ হিসেবে কঙ্গোয় প্রাণ হারিয়েছেন ৪০১৮ জন। নিশ্চিত আক্রান্ত প্রায় ৮৩০০। অর্থাৎ আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই আর জীবনে ফেরেননি। সংবাদ সংস্থা এপি জানিয়েছে, এটি ইতিহাসের দ্রুততম গতিতে ছড়ানো এবোলা প্রকোপ।

কিন্তু এবোলার বিরুদ্ধে কেন এত কঠিন এই লড়াই? শুধুই কি ভাইরাসের চরিত্র? নাকি আছে অন্য কোনও কারণ?

এই এবোলা আগের মতো নয়?


এবোলা ভাইরাসের (Ebola virus) একাধিক প্রজাতি আছে। এ বারের প্রকোপের পিছনে রয়েছে বুন্দিবুগিও (Bundibugyo)। এটি প্রথম চিহ্নিত হয়েছিল ২০০৭ সালে উগান্ডায়।

সমস্যা এখানেই। এখন পর্যন্ত অনুমোদিত সব এবোলা ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে জায়ার (Zaire) প্রজাতির জন্য। বুন্দিবুগিওর বিরুদ্ধে স্বীকৃত কোনও ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। ফলে চিকিৎসকদের ভরসা কার্যত সহায়ক চিকিৎসা আর সংক্রমণ আটকানোর চেষ্টা।

কোথায় শুরু, কতদূর ছড়াল

গত ১৫ মে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (Democratic Republic of the Congo) প্রকোপের কথা ঘোষণা করে। রোগের উৎসকেন্দ্র ছিল উত্তর-পূর্বের ইটুরি (Ituri) প্রদেশ। এর পরেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) একে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা (Public Health Emergency of International Concern) বলে ঘোষণা করে।

কঙ্গোয় এটি ১৭তম এবোলা প্রকোপ। আগের প্রকোপ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ফের হানা দিয়েছে ভাইরাস। কীভাবে ছড়াল, তা এখনও অজানা।

এখন সংক্রমণ ছড়িয়েছে সাত প্রদেশে। ইটুরি, উত্তর কিভু (North Kivu), দক্ষিণ কিভু (South Kivu), বাস-উএলে (Bas-Uele), উত-উএলে (Haut-Uele), চোপো (Tshopo) এবং সবার শেষে উত্তর-পশ্চিমের দক্ষিণ উবাঙ্গি (South Ubangi)। গত মাসে পূর্ব কঙ্গো থেকে যাওয়া এক ব্যক্তির মৃত্যুর পরই সেখানে প্রকোপ ধরা পড়ে।

কঙ্গোর ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী এবোলা প্রকোপ। বিশ্বে এর আগে শুধু ২০১৪-১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার সংক্রমণের ব্যাপকতার রেকর্ড। সেবার গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। মারা গিয়েছিলেন ১১ হাজারের বেশি।

স্বস্তি নেই কেন?

আইটিভি-র হিসেবে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৮৫০ জন নতুন আক্রান্ত ও ৪৭০ জনের মৃত্যু হচ্ছিল। সেপ্টেম্বরে সাপ্তাহিক গড় নেমেছে প্রায় ৪৯০ ও ২৩০-এ। ২০০০-এর বেশি রোগী সেরেও উঠেছেন।

তবু আফ্রিকা সিডিসি (Africa CDC) সতর্ক করেছে। তাদের মতে, নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা কমার পিছনে নিরাপত্তাহীনতা আর স্থানীয়দের অসহযোগিতাও থাকতে পারে। অর্থাৎ, পরীক্ষাই হয়তো কম হচ্ছে। সংক্রমণ ছড়ালেও সে খবর দেওয়া হচ্ছে না। রয়টার্সের খবর, ইটুরির কিছু অংশে সংক্রমণ ধীর হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও উত্তর কিভু-সহ পূর্ব কঙ্গোয় ভাইরাস এখনও দ্রুত ছড়াচ্ছে।

লড়াইয়ে বাধা কোথায়

প্রথম বাধা, বকেয়া বেতন। ইটুরির রাজধানী বুনিয়ায় (Bunia) স্বাস্থ্যকর্মীরা বকেয়া মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেছেন। প্রকোপ শুরুর পর থেকে সামনের সারির কর্মীরা একাধিকবার ধর্মঘটও করেছেন।

দ্বিতীয় বাধা, অবিশ্বাস। গত মাসে প্রশাসন গ্রামকেন্দ্রিক পদ্ধতি (village-centred approach) চালু করে। কিন্তু কিছু বাসিন্দা এবোলাকে ভুয়ো বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। রবিবার উত্তর কিভুর বুটেম্বোতে (Butembo) শাসক দলের স্থানীয় নেতা মারি-সেলেস্তাঁ কারোন্ডোয়ার বাড়িতে হামলা হয়েছে। উল্লেখ্য, বুটেম্বো এই প্রকোপের অন্যতম কেন্দ্র।

তৃতীয় বাধা, আস্ত একটি চিকিৎসা-কেন্দ্র হারানো। বুনিয়ার উপকণ্ঠে কিগোনজে (Kigonze) শিবিরে রোগীদের জন্য ট্রানজিট সেন্টার পুড়ে গিয়েছে। এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অস্ত্রের খোঁজে তল্লাশি চালাতে গিয়ে ওই কেন্দ্রে সেনারা আগুন ধরিয়ে দেন। ১৯ হাজার মানুষ শিবির ছেড়ে পালিয়েছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের এবোলা-বিষয়ক শীর্ষ আধিকারিক জুলিয়েন হারনেইস (Julien Harneis) জানিয়েছেন, শিবিরটি এখন পরিত্যক্ত। তাঁর মতে, এই ঘটনার জেরে লড়াই আরও কঠিন হয়ে গেল। নতুন চিকিৎসা-কেন্দ্র গড়তে টাকা ও কর্মী দুটোই কম পড়ছে।

এর মধ্যেই মেডেসিন্স স্যাঁ ফ্রঁতিয়ের (Médecins Sans Frontières) এক কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। সংস্থা জানিয়েছে, কঙ্গোয় এত বড় মানবিক ক্ষতি আগে কখনও দেখা যায়নি।

ভ্যাকসিনের দৌড় কতদূর

অতিমারী বা মহামারী মোকাবিলার আন্তর্জাতিক জোট সিইপিআই (Coalition for Epidemic Preparedness Innovations) সর্বোচ্চ স্তরের তৎপরতা শুরু করেছে। ৩ আগস্ট কানাডার নোভা স্কোশিয়ায় মডার্নার (Moderna) mRNA-১৪৬৯ ভ্যাকসিনের প্রথম পর্যায়ের মানব-পরীক্ষা (Phase 1 trial) শুরু হয়েছে। হিলম্যান ল্যাবরেটরিজ (Hilleman Laboratories) পাচ্ছে ৮.৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। মিশরের সংস্থা মিনাফার্মা (Minapharm) পাচ্ছে ১৬.৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।

পাশাপাশি দেখা হচ্ছে, জায়ার প্রজাতির জন্য তৈরি এরভেবো (Ervebo) ভ্যাকসিন কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে কি না। এ জন্য তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার (Phase 3 trial) সুপারিশ করেছে হু-র কারিগরি উপদেষ্টা গোষ্ঠী।

সিইপিআই-এর প্রধান ডা. রিচার্ড হ্যাচেট (Richard Hatchett) পরিষ্কার জানিয়েছেন, সবচেয়ে দ্রুত সময়সূচি ধরলেও বুন্দিবুগিওর ভ্যাকসিন আপাতত মিলবে না।

ভারত ও বাংলার জন্য কতটা চিন্তা

হু-র ঘোষণার পরই মে মাসে ভারত সরকার এবোলা-আক্রান্ত অঞ্চলে যাওয়া বা সেখান থেকে ফেরা মানুষের জন্য পরামর্শ জারি করেছে। বিমানবন্দরে বাড়তি স্বাস্থ্য-পরীক্ষার নির্দেশও রয়েছে। কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে আসা যাত্রীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

ভারতে সংক্রমণের কোনও খবর এখনও সামনে আসেনি। এবোলা বাতাসে ছড়ায় না। ফলে সাধারণ মানুষের আতঙ্কের কারণ নেই। তবে আপনার পরিবারের কেউ, কিংবা পরিচিত কোনও পড়ুয়া বা ব্যবসায়ী মধ্য আফ্রিকা থেকে ফিরলে সতর্ক থাকা ভাল। ফেরার তিন সপ্তাহের মধ্যে জ্বর বা শরীর খারাপ হলে নিজে ওষুধ না খেয়ে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জানান।

এবোলা ছড়ায় কীভাবে, কী কী উপসর্গ

সংক্রমিত মানুষ বা প্রাণীর রক্ত, বমি, লালা-সহ শরীরের তরলের সংস্পর্শে ছড়ায় এই ভাইরাস। মৃত্যুর পরেও দেহে ভাইরাস সক্রিয় থাকে। তাই সৎকারের সময় সংস্পর্শ সংক্রমণের বড় পথ। কোভিডের মতোই প্রাকৃতিক আধার হিসেবে এক্ষেত্রেও বাদুড়কে সন্দেহ করা হয়।

শুরুটা হয় জ্বর, বমি আর ডায়েরিয়া দিয়ে। অবস্থা গুরুতর হলে একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে।