Explained: ব্রহ্মপুত্রের মেগা বাঁধ তৈরি করে বিপদে চিন, ভয়ঙ্কর ‘জলবোমা’ বিস্ফোরণের ছায়ায় বাংলা

চিনের তৈরি ব্রহ্মপুত্র মেগা ড্যাম (AI নির্মাণ)

তিব্বতের বুকে চিনের তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে এত দিন যে আশঙ্কার কথা বার বার বলে আসছিল ভারত, এ বার সেই আশঙ্কাতেই সিলমোহর দিল খোদ চিনা বিজ্ঞানীদের গবেষণা। ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর তৈরি হওয়া এই মেগা বাঁধের ঠিক তলাতেই রয়েছে একটি সক্রিয় চ্যুতিরেখা বা অ্যাকটিভ ফল্ট লাইন, এমনই দাবি করেছেন চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের তত্ত্বাবধানে হওয়া একটি গবেষণা। ভারতে এই নদীই পরিচিত ব্রহ্মপুত্র নামে, যা আসাম পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নামে। গবেষকদের সাফ কথা, বাঁধের কাঠামো সুরক্ষিত রাখতে ঢাল মজবুত করা এবং ধস ঠেকাতে বাড়তি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। কিন্তু তাতেও বিপর্যয় এড়ানো যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান বিজ্ঞানীরা।

গবেষণায় ঠিক কী উঠে এসেছে

চেংডু ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং জাংবো নদী প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে হওয়া এই সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে চিনা ভাষার জার্নাল সেডিমেন্টারি জিওলজি অ্যান্ড টেথিয়ান জিওলজিতে। গবেষকদের বক্তব্য, পাইঝেন ফল্ট নামের এই চ্যুতিরেখা বরফযুগ বা প্লাইস্টোসিন কাল থেকেই সক্রিয়, এমনকি প্রায় ৯৫০০ বছর আগেও এই চ্যুতিতে সঞ্চালন ঘটেছিল। প্রকল্প এলাকার শিলাস্তর আলগা এবং দুর্বল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণাপত্রে। দীর্ঘদিন জলাধারের জলে ডুবে থাকা এবং একই সঙ্গে টেকটোনিক পাতের সঞ্চালন, এই দুইয়ের যুগলবন্দিতে বাঁধের ভিত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। জলাধারের দুই পাশের ঢাল যে কোনও মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে, এমন সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে রিপোর্টে।


কতটা ঝুঁকির এই বাঁধ

অরুণাচলপ্রদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে, যেখানে ইয়ারলুং সাংপো নদী বিশ্বের গভীরতম গিরিখাতের ভিতর দিয়ে বাঁক নিয়েছে, ঠিক সেই গ্রেট বেন্ড অঞ্চলেই তৈরি হচ্ছে এই বাঁধ। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষস্থল হিমালয়ের এই বলয় পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। গবেষকরা উদাহরণ টেনেছেন ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিনে হওয়া ৬.৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের, যার উৎসস্থল ছিল এই একই চ্যুতিরেখার উত্তর প্রান্তে। বছরে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট প্রতি ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্প থ্রি গর্জেস বাঁধের চেয়ে তিন গুণ বেশি শক্তিশালী হতে চলেছে। পাঁচটি ক্যাসকেড বাঁধের সমন্বয়ে তৈরি এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ১৬ লক্ষ কোটি টাকা।

জলবোমার আশঙ্কা

শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিই নয়, ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ভূরাজনৈতিক সমীকরণও। বিদেশ মন্ত্রকের দীর্ঘদিনের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কোনও সংঘাত বা টানাপোড়েনের সময় জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে বেজিং কার্যত অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহার করতে পারে এই বাঁধকে। শুকনো মরসুমে জল আটকে রেখে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের কৃষি এবং জনজীবনে সংকট তৈরি করা যেমন সম্ভব, তেমনই আচমকা বিপুল জল ছেড়ে দিয়ে অরুণাচল প্রদেশ, আসাম হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত ভয়াবহ বন্যা তৈরি করারও আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। অরুণাচলপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এই প্রকল্পকে রাজ্যের কাছে অস্তিত্বের সংকট বলে বর্ণনা করেছেন, একে জলবোমার সঙ্গেও তুলনা করেছেন তিনি।

বাংলার কপালেও কেন ভাঁজ

ব্রহ্মপুত্র সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত না হলেও, এই বাঁধ ঘিরে অনিশ্চয়তার আঁচ থেকে রাজ্য মোটেই দূরে নয়। মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গার উপর অবস্থিত ফারাক্কা ব্যারাজ শুধু জলসেচের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এই ব্যারাজের উপর দিয়েই গিয়েছে জাতীয় সড়ক ৩৪ এবং রেলপথ, যা উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গকে যেমন জুড়ে রেখেছে, তেমনই গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের সংযোগও বজায় রাখে এই করিডর দিয়েই। জাতীয় জল উন্নয়ন সংস্থার (National Water Development Agency, NWDA) প্রস্তাবিত নদী সংযোগ পরিকল্পনায় ব্রহ্মপুত্রের জোগিঘোপা থেকে তিস্তা হয়ে ফারাক্কা পর্যন্ত জল সংযুক্তির কথাও রয়েছে, যদিও প্রকল্পটি এখনও বাস্তবায়নের আগের ধাপে। উত্তরবঙ্গের তিস্তা, তোর্সার মতো নদীগুলিও একই পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহ ও মৌসুমি বৃষ্টিনির্ভর নদী-ব্যবস্থার অংশ, ফলে উজানে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বড়সড় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে তার ঢেউ কার্যত গোটা পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের নদী-অর্থনীতিতেই আছড়ে পড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের। শিলিগুড়ি করিডর সংলগ্ন এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বের কথা মাথায় রাখলে বিষয়টি রাজ্যের প্রশাসনের কাছে অতীব গুরুত্বের।

চিনের দাবি বনাম বাস্তবতা

এত দিন চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্ররা বারবার আশ্বাস দিয়ে এসেছেন যে, কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েই তৈরি হয়েছে এই বাঁধ। নদীর নিম্ন অববাহিকা অঞ্চলের কোনও দেশের ক্ষতি হবে না এই প্রকল্পের কারণে। কিন্তু চিনা সংস্থার তত্ত্বাবধানেই হওয়া এই সাম্প্রতিক গবেষণা কার্যত সেই আশ্বাসের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার ফারাকটাই সামনে নিয়ে এসেছে।

কূটনৈতিক টানাপোড়েন

চিনের এই মেগা প্রকল্পের পাল্টা হিসেবে অরুণাচল প্রদেশে ১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্টের (Siang Upper Multipurpose Project, SUMP) পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভারত। এক্সপার্ট লেভেল মেকানিজমের (Expert Level Mechanism, ELM) মাধ্যমে চিনের কাছে বাঁধ সংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি এবং স্বচ্ছতার দাবিও জানিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। তবে ব্রহ্মপুত্রের জলবণ্টন নিয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই, যা গোটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেই মত কূটনৈতিক মহলের।