ইসলামিক ন্যাটোয় সামিল বাংলাদেশ? ইস্তানবুলে পাক-সৌদি-তুর্কিয়ের প্রথম বৈঠকেই লুকিয়ে ইঙ্গিত, চিন্তায় ভারত

Bangladesh Prime Minister Tarique Rahman (Pic: BNP)

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mecca Joint Defence Agreement)। পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুর্কিয়ের মধ্যে সই হওয়া এই চুক্তির পর এ বার প্রথম বার একসঙ্গে বৈঠকে বসছেন তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানেরা। বৈঠক বসছে ইস্তানবুলে (Istanbul)। আর এই বৈঠকের অ্যাজেন্ডাতেই লুকিয়ে রয়েছে এক বড় ইঙ্গিত, যার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান। পরোক্ষে যার জেরে বদলে যাবে ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীদের কূটনৈতিক সম্পর্কও।

কী এই মক্কা চুক্তি

চলতি বছরের ৭ আগস্ট মক্কার আল-সাফা প্রাসাদে (Al-Safa Palace) সই হয় এই ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি। ন্যাটোর (NATO) ধাঁচে তৈরি এই চুক্তির মূল কথা হল, তিন দেশের যে কোনও একটির উপর সামরিক আক্রমণ হলে সেটিকে গোটা জোটের উপর আক্রমণ হিসেবেই ধরা হবে। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যুদ্ধের পরে সৌদি ভূখণ্ডে ইরানি ড্রোন হামলার আশঙ্কা থেকেই এই জোট গঠনের তাগিদ বাড়ে। উল্লেখ্য, এর আগে গত বছর সেপ্টেম্বরে রিয়াধে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (Strategic Mutual Defence Agreement) সই হয়েছিল, যা এই ত্রিদেশীয় সমঝোতার ভিত তৈরি করে দেয়।

এই জোটের শক্তি বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে চুক্তিটি। তুর্কিয়ের কাছে রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী। এদিকে পাকিস্তান হলো একমাত্র পরমাণু শক্তিধর মুসলিম দেশ। আর সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারী দেশ। ফলে এহেন তিনটি শক্তির মেলবন্ধন যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড়সড় পরিবর্তন তা বসে দিতে কোনও বিশেষজ্ঞের দরকারও পড়ে না।


ইস্তানবুল বৈঠকে কী নিয়ে কথা

তুর্কিয়ের বিদেশ মন্ত্রকের সূত্র উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, ইস্তানবুলের এই বৈঠকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নেও কথা বলবেন প্রতিনিধিরা। মূলত চুক্তি বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি এবং তিন দেশের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর দিকেই জোর দেওয়া হবে বলে জানা যাচ্ছে। তুর্কিয়ের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এর্দোয়ানের (Recep Tayyip Erdogan) কথা অনুযায়ী, এই জোটে মিশরও (Egypt) যোগ দিতে পারে। যদিও গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে কায়রোর কূটনৈতিক সমীকরণের কারণে সেই পথ এখনও কণ্টকাকীর্ণ।

বাংলাদেশের ‘মক্কা স্বপ্ন’

আর এখানেই ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি জানিয়েছেন, ইসলামি দেশগুলির মধ্যে তৈরি এমন একটি পারস্পিরিক সমঝোতাভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশ নেওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাঁর কথায়, বিষয়টিকে ইতিবাচক ভাবেই দেখা হচ্ছে। ঢাকার এই আগ্রহের পিছনে কাজ করছে সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি, অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে রাখার কৌশল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রিয়াধ সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন। গ্রীষ্মের পরেই সেই সফর চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।

তবে ঢাকা এখনই পুরোপুরি প্রতিরক্ষা জোটে ঢুকে পড়তে চাইছে, না কি অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে, সেই প্রশ্নে এখনও কোনও স্পষ্ট দিগনির্দেশ আসেনি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখেই শোনা গিয়েছে ‘অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামো’ শব্দবন্ধ, যা থেকে অনেকে মনে করছেন ঢাকা আপাতত সতর্ক পথেই হাঁটছে।

দিল্লির নজরদারি

বাংলাদেশ যদি সত্যিই এই পরমাণু শক্তিধর প্রতিরক্ষা জোট বা ইসলামিক ন্যাটোয় সামিল হয়, তা হলে তার আঁচ সরাসরি এসে পড়বে সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের নিরাপত্তা সমীকরণে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, বিষয়টির উপরে নজর রাখা হচ্ছে, কারণ এর সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ২০০০ কিলোমিটারের সীমান্ত। অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সীমান্ত পারের বাণিজ্য, এই তিন বিষয়ই রাজ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আলোচ্য। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার কূটনৈতিক অভিমুখ বদলালে সীমান্ত-রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নীতিতেও তার প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক নয়।

অর্থাৎ, সামগ্রিকতার নিরিখে ইস্তানবুলের সম্মেলন নিছক তিন দেশের সমন্বয়ের বৈঠক নয়। এই বৈঠকের ফলাফলের উপরেই অনেকাংশে নির্ভর করছে, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটবে।