অর্থ, পেশিশক্তি ও হিংসা: বাংলাদেশের নির্বাচনে অশান্তির শুরু

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনের আগে থেকেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ব্যাপক হিংসার আশঙ্কা করেছিল। সেই আশঙ্কাই সত্যি হল। ভোটগ্রহণ শুরু হতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হিংসার খবর সামনে এসেছে।

পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিস্থিতি তিক্ত পরিণতির দিকে গড়াতে পারে। বৃহস্পতিবার ভোরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর এক নেতা ছুরিকাহত হন, যার পর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিএনপি অভিযোগ করেছে, জামায়াতে ইসলামী ভোটারদের টাকা দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। এক জামায়াত নেতার কাছ থেকে ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধার হওয়ার পর এই অভিযোগ ওঠে। ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

শুধু জামায়াত নয়, বিএনপি কর্মীরাও নগদ অর্থসহ ধরা পড়েছেন। তাঁরাও তার যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ১,০২,০০০ টাকা ও নির্বাচনী স্লিপসহ দুই বিএনপি কর্মীকে সেনাবাহিনী আটক করে। সেনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে।


এক গোয়েন্দা আধিকারিক জানান, নির্বাচনের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে দুই পক্ষই হিংসা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। যদিও ৫০টিরও বেশি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে, লড়াই মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, জামায়াতের জয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তবে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। উভয় দলই যেখানে নিজেদের সম্ভাবনা কম দেখছে, সেখানে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ। ভোট কেনাবেচার জন্য বিপুল অর্থের লেনদেন চলছে বলেও দাবি প্রশাসনের।

পুরনো ঢাকায় জামায়াত নেতা মোহাম্মদ হাবিবকে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিলি করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শরীয়তপুরে ৭,৫০,০০০ টাকা সহ আরও এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়। লক্ষ্মীপুরে কৃষক দলের সঙ্গে যুক্ত একটি গাড়ি থেকে ১৫ লাখ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জাতীয় পার্টির দুই নেতাকে ভোটারদের মধ্যে অর্থ বিতরণের অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে।

এক কর্মকর্তা জানান, দিন যত এগোবে, নির্বাচনের ফল কোন দিকে যাচ্ছে তা দলগুলি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবে। সেই সময়টিই সবচেয়ে স্পর্শকাতর, কারণ পিছিয়ে পড়া দল সমর্থকদের উসকে দিতে পারে। ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত রাখতে হুমকির অভিযোগও উঠেছে। গোপালগঞ্জে ভোটকেন্দ্রের কাছে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে, যা ভোটারদের আতঙ্কিত করার চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

ভোট চুরি, হিংসা ও অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার অভিযোগের পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দু সম্প্রদায় নির্বাচনে ‘সুইং ফ্যাক্টর’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও জামায়াত তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে, তবুও অধিকাংশ হিন্দু ভোটার বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন বলে ধারণা। ফলে জামায়াত তাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ।

খুলনা-৫ আসনে হিন্দু ভোটারদের বিএনপি বা অন্য কোনও দলকে ভোট না দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক স্থানীয় জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। কর্মকর্তাদের মতে, জামায়াত পিছিয়ে পড়লে নির্বাচন ব্যাহত করার পরিকল্পনাও থাকতে পারে।

এদিকে নিরাপত্তা বাহিনী উচ্চ সতর্কতা জারি রেখেছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বাহিনী সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।