বাংলাদেশে নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ সমর্থকদের চিহ্নিত হওয়ার ভয় দেখিয়ে ভোটে বাধ্য করার অভিযোগ

বাংলাদেশে চলতি মাসেই জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হলেও ভোটের পরিবেশ ঘিরে আতঙ্ক ক্রমশ বাড়ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ রাজনীতির ময়দান থেকে কার্যত বাইরে চলে যাওয়ায় মূল লড়াই এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং জামাত-ই-ইসলামির মধ্যে। তবে নির্বাচনী প্রচারের আড়ালে যে ভয় ও হুমকির রাজনীতি চলছে, তা দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামি লিগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলের সমর্থকদের বড় অংশ শুরুতে ভোট বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচার যত এগোচ্ছে, ততই পাল্টাচ্ছে সেই মনোভাব। কারণ, ভোট না দিলে ‘চিহ্নিত’ হওয়ার ভয়। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, জামাত ও বিএনপি ঘনিষ্ঠ মহল থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে, ভোটকেন্দ্রে না গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আওয়ামি লিগ সমর্থক ধরে নেওয়া হবে।

বিশেষ করে জামাত-ই-ইসলামি তাদের প্রচারে এমন এক বয়ান তৈরি করেছে, যেখানে আওয়ামি লিগকে সমর্থন মানেই ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা। গ্রামে-শহরে জামাত প্রার্থীদের প্রকাশ্যে বলতে শোনা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার দলের পাশে থাকলে তার ফল ভোগ করতেই হবে। এই আবহে বহু আওয়ামি লিগ সমর্থক চূড়ান্ত দোটানায় পড়েছেন। ভোট বয়কট করলে বিপদ, আবার ভোট দিলেও পরিচয় ফাঁসের আশঙ্কা।


গোয়েন্দা দপ্তরের এক আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, জামাতের তরফে আলাদা দল গঠন করা হয়েছে, যারা নজর রাখবে কে ভোট দিতে বেরোলেন আর কে বেরোলেন না। ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আওয়ামি লিগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করার ছক তৈরি করা হয়েছে। ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়েই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যদিও তাঁরা প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্বীকার করছেন না।

বিএনপি ও জামাত—দুই শিবিরই দাবি করছে, শেখ হাসিনার শাসনকালে তাঁদের উপর ব্যাপক নির্যাতন নেমে এসেছিল। জামাতের ক্ষেত্রে দল নিষিদ্ধ হওয়া ও সদস্যদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্বের অভিযোগ, খালেদা জিয়াসহ বহু শীর্ষ নেতাকে দীর্ঘদিন জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অতীত ক্ষোভ থেকেই এখন প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা কাজ করছে।

জামাত বিশেষ ভাবে চাইছে আওয়ামি লিগকে রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে। তাদের প্রচার কেবল ভোট চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আওয়ামি লিগ সমর্থকদের উদ্দেশে স্পষ্ট হুঁশিয়ারিও দেওয়া হচ্ছে। ভোট বয়কট করলে তার ফল ভালো হবে না।

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার জেরে হাজার হাজার আওয়ামি লিগ নেতা-কর্মী বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তাঁদের বড় অংশ বর্তমানে কলকাতার টালিগঞ্জ অঞ্চলে অবস্থান করছেন। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠনের ছক কষা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। একই সঙ্গে তাঁরা যোগাযোগ রাখছেন দিল্লিতে থাকা শেখ হাসিনার সঙ্গেও।

গত কয়েক সপ্তাহে শেখ হাসিনা নিজে বাংলাদেশের ভিতরে ও কলকাতায় থাকা দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন বলে জানা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আওয়ামি লিগ যদি ভবিষ্যতে প্রাসঙ্গিক থাকতে চায়, তবে দ্রুত সংগঠনকে সক্রিয় করতে হবে।

অন্যদিকে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও জামাত-ই-ইসলামি একযোগে আওয়ামি লিগকে কোণঠাসা করতে তৎপর, এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। নির্বাচনের আগে দলের তরফে ভোট বয়কটের আহ্বান জানানো হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হবে না বলেই মনে করছেন বাংলাদেশ পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, পরিচয় ফাঁস ও সম্ভাব্য হেনস্থার ভয় এতটাই গভীর যে, অধিকাংশ আওয়ামি লিগ সমর্থক শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধ্য হবেন।