বাংলাদেশের মসনদে বিএনপি

নির্বাচনী লড়াইয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলেছিল বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি। গণনার ফল বলছে, সেই বার্তাই মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রায় দুই দশক পর ফের ঢাকার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে চলেছে প্রয়াত রাষ্ট্রনেত্রী খালেদা জিয়া-র দল।

এ বারের নির্বাচনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘নৌকাবিহীন’ ভোট। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ-এর প্রতীক অনুপস্থিত ছিল ব্যালটে। ফলে শুরু থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা ছিল, ‘ধানের শিষ’ প্রতীক এগিয়ে থাকবে। ফলাফল সেই অনুমানকেই অনেকাংশে সত্যি প্রমাণ করেছে।

তবে ভোটের ময়দানে নতুন শক্তিও আত্মপ্রকাশ করেছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণ নেতৃত্বের দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয়। তারা জোট বাঁধে জামায়েতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর সঙ্গে। কিন্তু চূড়ান্ত ফলে দেখা যাচ্ছে, দুই অঙ্কের আসনও পায়নি তারা। পরাজিত হয়েছেন একাধিক শীর্ষ নেতা।


গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা-কে কেন্দ্র করে। সেই দ্বিমেরু রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ডাক দিয়েছিল নতুন প্রজন্মের শক্তি। কিন্তু ভোটের রায়ে স্পষ্ট, অচেনা নেতৃত্বের বদলে পরিচিত রাজনৈতিক শক্তিকেই ভরসা করেছেন সাধারণ মানুষ। আওয়ামী লীগের প্রধান বিকল্প হিসেবে এখনও বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টিকেই বেছে নিয়েছেন ভোটাররা।

দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ভাষায়, এটি ‘প্রত্যাবর্তন’ নয়, ‘দাপুটে প্রত্যাবর্তন’। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি তারা। ২০১৮ সালে অংশ নিয়ে জিতেছিল মাত্র সাতটি আসন। একসময় রাজনৈতিক মহলে দলটিকে অপ্রাসঙ্গিক বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।

এই সময় একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হন দলের বহু নেতা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও ওঠে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এবং লন্ডনে অবস্থানরত তাঁর পুত্র তারিক রহমান-এর অনুপস্থিতি দলকে চাপে ফেলে। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড এবং ২০১৫ সালে কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু— জিয়া পরিবারেও নেমে আসে কঠিন সময়।

পরিস্থিতির মোড় ঘোরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। গণবিক্ষোভের জেরে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আসেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস। সেই প্রেক্ষাপটেই এবারের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ফলাফল বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও পুরনো সমীকরণই প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে। তবে এই জয়ের সঙ্গে বেড়েছে প্রত্যাশাও। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো মজবুত করাই এখন নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।