এশিয়ায় নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল অস্ট্রেলিয়া সরকার। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মার্ক বাটলার জানিয়েছেন, এই ভাইরাসের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি চালাচ্ছে এবং গোটা পরিস্থিতি ‘খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ’ করা হচ্ছে।
শুক্রবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মার্ক বাটলার স্পষ্টভাবে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় এখনও পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের কোনও সংক্রমণ ধরা পড়েনি। তবে ডিসেম্বর মাসে ভারতে যে সংক্রমণ শুরু হয়েছে, তাকে আমরা মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছি না।’ তাঁর বক্তব্য, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তবু এই ভাইরাস অত্যন্ত মারাত্মক প্রকৃতির হওয়ায় আমরা একে খুব গুরুত্ব সহকারে দেখছি। নিয়মিত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছি।’
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশ থেকে আগত অসুস্থ যাত্রীদের জন্য ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য প্রোটোকল চালু রয়েছে। মার্ক বাটলার জানিয়েছেন, আপাতত সেই নিয়মে কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা যায়নি। তাঁর কথায়, ‘বিদেশ থেকে আসা অসুস্থ যাত্রীদের জন্য আমাদের স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। এখনও পর্যন্ত সেই নিয়ম বদলানোর মতো কোনও পরামর্শ সরকার পায়নি।’
এই উদ্বেগের আবহেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের উপর কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলীয় পর্যটকদের মধ্যে বালি অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হওয়ায়, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ আরও কঠোর করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপা ভাইরাস একটি ‘জুনোটিক’ রোগ— অর্থাৎ এটি পশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। আবার মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে। কখনও কখনও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমেও এক মানুষের থেকে আর এক মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রোগজীবাণু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ এটি দ্রুত মহামারির আকার নিতে পারে। আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মারাত্মক অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
ইতিহাস বলছে, ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় শূকর পালনকারীদের মধ্যে প্রথম নিপা ভাইরাস শনাক্ত হয়। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া থেকে অসুস্থ শূকর আমদানির ফলে সিঙ্গাপুরেও সংক্রমণ ছড়ায়। এরপর দীর্ঘ সময় ওই দুই দেশে নতুন সংক্রমণ ধরা পড়েনি। ২০০১ সালে ভারত ও বাংলাদেশে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। ভারতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে। সাম্প্রতিকতম সংক্রমণ ধরা পড়ে ২০২৬ সালে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়াতে পারে। বিশেষ করে যেখানে ভিড় বেশি, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা দুর্বল এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিকভাবে মানা হয় না। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুনাশ এবং হাত ধোঁয়ার মতো মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি না মানলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া সরকার স্পষ্ট করেছে, সীমান্ত স্বাস্থ্য নজরদারি, যাত্রী পর্যবেক্ষণ, এবং রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় রাখা হবে। স্বাস্থ্য দপ্তরের এক কর্তার বক্তব্য, ‘এটি শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। নিপা ভাইরাস বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। তাই আগাম সতর্কতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াই একমাত্র পথ।’
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, নিপা ভাইরাস নিয়ে এখনই উদাসীন হলে ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলির এই সতর্ক অবস্থান আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।