হরমুজ়ে ইরানি হামলায় নিহত ভারতীয়, শেষ বার্তাই হয়ে রইল শেষ স্মৃতি

Photo: Statesman

‘ভারতীয় জাহাজ নিরাপদেই হরমুজ় প্রণালী পার করেছে। চিন্তার কিছু নেই।’ পরিবারকে এমনটাই জানিয়েছিলেন ভারতীয় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হেরম্ব কর্মকার। ভারতীয় নাবিকের কাছ থেকে সে কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সেটাই যে তাঁর পাঠানো শেষ বার্তা ছিল, তা ঘুণাক্ষুরেও টের পায়নি হেরম্বের পরিবার। গত ২ দিন ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। অবশেষে বুধবার তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছয় পরিবারের কাছে। ওমান উপকূলের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়া সাইপ্রাসের পতাকাবাহী কন্টেনার জাহাজ ‘জিএফএস গ্যালাক্সি‘-তে কর্মরত ৩০ বছরের ভারতীয় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হেরম্ব কারমারকরের মৃত্যু হয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমশ উত্তেজনা বাড়ছে। এর মধ্যে হরমুজ় প্রণালীতে ফের এক ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারালেন। পুণের বাসিন্দা হেরম্ব পেশায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। গত রবিবার ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ় প্রণালী পার হওয়ার সময় তিনি যে জাহাজে ছিলেন, সেটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। হামলার আগেই তিনি পরিবারকে জানিয়েছিলেন, জাহাজ নিরাপদে হরমুজ় প্রণালী পার হয়ে গিয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পরিবারের দুশ্চিন্তাও কমে। কিন্তু তাঁর সেই আশ্বাস শেষ পর্যন্ত তাঁর শেষ বার্তা হয়ে রইল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই হামলার মুখে পড়ে জাহাজটি।

ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার। ওমানের উপকূলের কাছে হরমুজ় প্রণালী পার হওয়ার সময় সাইপ্রাসের পতাকাবাহী কন্টেনার জাহাজ ‘জিএফএস গ্যালাক্সি’-র উপরে হামলা হয়। সাইপ্রাসের পতাকা লাগানো বাণিজ্যতরীটিতে ২৪ জন নাবিক ছিলেন। এর মধ্যে ১১ জন ভারতীয়। হামলার পরে ১০ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু নিখোঁজ ছিলেন হেরম্ব কর্মকার। এরপর থেকেই ওমান কর্তৃপক্ষ, জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা এবং ভারতীয় দূতাবাস যৌথভাবে তাঁর খোঁজে তল্লাশি শুরু করে। ২ দিন ধরে আশায় বুক বেঁধে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু বুধবার সেই আশা মৃত্যুসংবাদে পরিণত হয়।


সাইপ্রাসের তরফে জানানো হয়েছে, জাহাজটিতে ‘অজ্ঞাত কারণে’ হামলা হয়। যদিও পরে ইরানের তরফে জানানো হয়, অবৈধ পথ দিয়ে জাহাজটি যাচ্ছিল। বারবার সতর্ক করা হলেও কর্ণপাত না করায় সেটির উপর হামলা চালানো হয়েছে। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই হেরম্বের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে তাঁর পরিবার। কর্মসূত্রে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকলেও পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন হেরম্ব। তাই তাঁর শেষ পাঠানো আশ্বাসবাণী এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।

হেরম্বের শ্বশুর বিবেক ট্যান্ডন আন্তর্জাতিক এক সংবাদসংস্থাকে জানিয়েছেন, পরিবারের কাছে তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছেছে। যদিও ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বা তাঁর দেহ কোথায় রয়েছে, সেই বিষয়ে এখনও বিস্তারিত জানানো হয়নি। পরিবারের একটাই আবেদন, যত দ্রুত সম্ভব দেহ অক্ষত অবস্থায় ভারতে ফিরিয়ে আনা হোক। যাতে শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে পান তাঁর প্রিয়জনেরা।

এই ঘটনার পর ভারত কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবারই দিল্লিতে ইরানের উপ-মিশন প্রধানকে তলব করে ভারতের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল। ইরানের কাছে আরও এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনার ব্যাখ্যা চায় দিল্লি। মঙ্গলবার বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানায়, এই ধরনের হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমিত করে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা জরুরি যাতে ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসে।’ এরপরই ফের আরও এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর খবর পৌঁছয়। হরমুজ় প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে পৌঁছয়। ফলে এই এলাকায় হামলার ঘটনা শুধু নাবিকদের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে না, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে এই জলপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির উপর হামলার ঝুঁকি আরও বেড়েছে। হেরম্ব কর্মকারের মৃত্যু সেই উদ্বেগকেই আরও একবার সামনে এনে দিল।

সরকারি সূত্রের খবর, ঘটনার উপর নজর রাখছে দিল্লি। এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশ ও জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। হেরম্বের দেহ দ্রুত ভারতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি হামলার কারণ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তও চলছে।