ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারে মায়ের বেঁচে থাকার লড়াই

Image: IANS

ভয়াবহ ভূমিকম্পের ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে বহুতল ভবন। চারদিকে ধুলো, চিৎকার আর মৃত্যুর আতঙ্ক। সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতেই এক মায়ের বুকে আঁকড়ে থাকা ১৮ দিনের নবজাতক সন্তান হয়ে ওঠে তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ডায়ানা পাতিনোর জীবন-মৃত্যুর লড়াই আজ এক গভীর মানবিক কাহিনি হিসেবে বিশ্বজুড়ে আলোচিত।
গত বুধবার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলা। সরকারি হিসাবে, অন্তত ১,৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে, এখনও নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ। দেশটির ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে উল্লেখ করেছেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে, তবে সময় যত এগোচ্ছে, ততই ম্লান হচ্ছে জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশা।
এই ভয়াবহতার মধ্যেই সামনে আসে এক অলৌকিক বেঁচে থাকার গল্প। রাজধানী কারাকাসের এক ক্লিনিকে শুয়ে ডায়ানা ফিরে দেখছিলেন সেই ভয়ঙ্কর সময়টাকে। ভূমিকম্পের মুহূর্তে তিনি ছিলেন লা গুয়াইরার একটি আটতলা আবাসনের অষ্টম তলায়। রান্নাঘরে বাসন ধোয়ার কাজ করছিলেন, আর কাছেই ছিল তাঁর সদ্যোজাত সন্তান হুয়ান ডেভিড।
হঠাৎ মাটি কেঁপে ওঠে। প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি তিনি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ডায়ানার কথায়, সবকিছু যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল শরীরটা যেন শূন্যে ভেসে উঠছে, তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু ধসে পড়ল, চারদিক ঢেকে গেল মাটি আর ধুলোয়, আর চোখের সামনে নেমে এল ঘন অন্ধকার।
ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে যান তিনি। কীভাবে সেই মুহূর্তেও তিনি সন্তানের শরীর থেকে হাত সরাননি, তা আজও তাঁর কাছে বিস্ময়। চারদিকে অন্ধকার, শরীরের ওপর ভাঙা কংক্রিটের ভার, এক পা আটকে গেছে ধ্বংসস্তূপে, মাথা পাথরের সঙ্গে চেপে আছে— এই অবস্থাতেই শুরু হয় তাঁর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।প্রথমে তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলেন।
কিন্তু দ্রুতই বুঝতে পারেন, সেই আওয়াজ বাইরে পৌঁছচ্ছে না। তখন নিজেকে সংযত করে নেন। সিদ্ধান্ত নেন, অযথা শক্তি নষ্ট করা যাবে না– শুধু তখনই ডাকবেন, যখন আশপাশে মানুষের উপস্থিতি টের পাবেন।অন্ধকারের মধ্যে তাঁর একমাত্র ভরসা ছিল তাঁর সন্তান। মাঝেমধ্যে হাত বাড়িয়ে সন্তানের মুখ ছুঁয়ে দেখছিলেন— সে ঠিক আছে কি না, নিঃশ্বাস চলছে কি না।
সেই ক্ষীণ আশ্বাসই তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। সন্তানের অস্তিত্ব যেন তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, লড়াই চালিয়ে যেতেই হবে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে কাটানো সেই সময় যেন থেমে থাকা এক অনন্তকাল। শারীরিক যন্ত্রণা ছিল তীব্র, কিন্তু মানসিক শক্তিই তাঁকে টিকিয়ে রাখে। একসময় তিনি অনুভব করেন, তাঁর হাতের নিচে একটি বাইবেল রয়েছে। সেই স্পর্শ যেন তাঁকে নতুন করে স্থিরতা দেয়, সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বেঁচে থাকার মানসিক প্রস্তুতি।
অন্ধকারের মধ্যে কোথা থেকে আসা এক ফোঁটা আলো তিনি দেখতে পান— অত্যন্ত ক্ষীণ, কিন্তু তবুও দেখা যাচ্ছে আলোর রেখা। সেই আলো যেন তাঁকে মনে করিয়ে দেয়, বাইরের পৃথিবী এখনও আছে, আশা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।অবশেষে আসে সেই মুহূর্ত, যার ফলে তাঁর ভাগ্য ঘুরে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তিনি শুনতে পান পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর— তাঁর ভাই তাঁকে খুঁজছেন।
সেই শব্দই হয়ে ওঠে তাঁর কাছে বাঁচার শেষ সংকেত। সমস্ত শক্তি জড়ো করে তিনি সাড়া দেন, জানান নিজের অবস্থান।ওপাশ থেকে আশ্বাস মেলে— তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেছে, এবং তাঁকে উদ্ধার না করে কেউ ফিরবে না। সেই প্রতিশ্রুতি ডায়ানার মধ্যে নতুন করে সাহস জাগায়।এরপর শুরু হয় অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল উদ্ধার অভিযান। অবশেষে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় মা ও শিশুকে। ডায়ানার দুই পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে, তবে তাঁর সন্তান তুলনামূলকভাবে অক্ষতই থাকে।
এই ঘটনার সময় ডায়ানার স্বামী গার্সন বাড়ির বাইরে ছিলেন। গাড়ি পার্ক করার পরই ভূমিকম্প শুরু হয়। তিনি কোনোমতে একটি দেয়াল টপকে নিজের প্রাণ বাঁচান। পরে ভেঙে পড়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল— সব শেষ।কিন্তু বাস্তব ছিল অন্যরকম। উদ্ধার অভিযানের সেই মুহূর্ত তাঁর কাছে জীবনের এক নতুন সূচনা। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিনি আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছেন, অতল আবেগে ভেঙে পড়া এক মানুষ।
গার্সনের কথায়, তিনি তখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, স্ত্রী ও সন্তান আর বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁদের জীবিত ফিরে পাওয়ার সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল, যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছেন।এই পরিবারটির প্রায় সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে— বাড়ি, সম্পদ, এমনকি তাঁদের প্রিয় পোষ্য কুকুরটিও এখনও নিখোঁজ। তবুও তাঁরা ভেঙে পড়েননি।
গার্সন বলেন, সব হারিয়েও তাঁরা বেঁচে আছেন, আর সেই বেঁচে থাকাটাই নতুন করে শুরু করার শক্তি জোগাচ্ছে। শূন্য থেকে আবার গড়ে তোলার সংকল্প নিয়েছেন তাঁরা।ডায়ানা ও তাঁর সন্তানের এই কাহিনি শুধু এক অলৌকিক উদ্ধার নয়, এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারে এক মায়ের ভালোবাসা কীভাবে জীবনকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে, তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ এই ঘটনা। ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আশা কখনও নিভে যায় না। কখনও কখনও সেই আশার উৎস হয়ে ওঠে এক নবজাতকের নিঃশ্বাস, এক মায়ের স্পর্শ।