সুপার এল নিনোয় পুড়ে ছারখার হবে বিশ্ব: সরকার বলছে এমন কোনও টার্ম-ই নেই বিজ্ঞানে, হচ্ছেটা কী?

Impact of Super El Nino In India (AI)

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একাংশের দাবি, ২০২৬ সালের এল নিনো (El Nino) পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হতে পারে যে সেটিকে সুপার এল নিনো নামে ডাকা উচিত। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশের জলতলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গেলে তবেই এই তকমা মেলে। এমন ঘটনা বিরল, এবং শেষবার এরকমই পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল ১৯৯৭ ও ২০১৫ সালে।

কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষ্য অন্যরকম। সরকারি বিবৃতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আবহাওয়াবিজ্ঞানে সুপার নামে কোনও পৃথক শ্রেণিই নেই। এল নিনো মানে, হয় স্বাভাবিক, নয়তো শক্তিশালী… এর বাইরে কোনও তৃতীয় ভাগ বিজ্ঞানসম্মতভাবে স্বীকৃত নয়। এই বিতর্কে পড়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই, তাহলে এবারের বর্ষাটা ভালোয় ভালোয় পেরোবে তো? শীত কেমন পড়বে?

স্বস্তি বহু দূর


জুন মাসে সারা দেশে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, যা ১৯০১ সালের পর পঞ্চম সবচেয়ে শুকনো জুন। জুলাইয়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) হিসেবে জুলাই মাস শেষ হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম বৃষ্টি নিয়ে। আগস্টে অবশ্য স্বাভাবিক বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা কৃষকদের জন্য কিছুটা আশার খবর।

পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা তুলনায় আলাদা। উত্তরবঙ্গে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, জলপাইগুড়ির মতো জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গেও মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরে বর্ষা সক্রিয় ছিল। জুলাইয়ের শেষে বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরির পূর্বাভাসও দিয়েছে মৌসম ভবন, যা আগামী দিনে রাজ্যের বৃষ্টিপাতে প্রভাব ফেলতে পারে।

Super El Nino Situation (windy.com)

যুদ্ধ আর বিদ্যুৎ, জোড়া চাপ

জলবায়ু বিজ্ঞানী রঘু মূর্তুগুড্ডে জানিয়েছেন, এবারের পরিস্থিতি আগের এল নিনো বছরগুলোর থেকে আলাদা, কারণ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে। বৃষ্টি কম হলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, আর জ্বালানির দাম বাড়তি থাকলে সেই চাহিদা মেটাতে কয়লার উপর নির্ভরতাও বাড়ে। ক্রেয়ার (CREA) একটি রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের মধ্যে ভারতের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রই এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই মরসুমে যদি গরম দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে রাজ্যে বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড ছুঁতে পারে, যেমনটা আগের গরমগুলোতেও দেখা গিয়েছে।

ধান চাষে দুশ্চিন্তা

পশ্চিমবঙ্গের কৃষি অর্থনীতির বড় অংশ এখনও বৃষ্টিনির্ভর ধান চাষের উপর দাঁড়িয়ে। দেশজুড়ে খরিফ মরসুমে ধানের চাষ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে, বৃষ্টি অনিয়মিত থাকলে এই ঘাটতি রাজ্যের ধান উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলন কমলে চালের দাম বাড়ার আশঙ্কা, যার আঁচ সরাসরি এসে পড়বে সাধারণ মানুষের হেঁশেলে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ অবশ্য মনে করাচ্ছেন, ২০১৫ সালের এল নিনোতেও ভারত ভালোভাবেই পরিস্থিতি সামলেছিল। তবে সেবার বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল না, এবার সেই বাড়তি অনিশ্চয়তাটাই মাথাব্যথার কারণ।

লা নিনার পালা

আমেরিকার জলবায়ু সংস্থা এনওএএ (NOAA) জানিয়েছে, শক্তিশালী এল নিনোর পরে সাধারণত লা নিনা (La Nina) আসার একটা ঐতিহাসিক প্রবণতা থাকে। তবে ঠিক কবে এই পরিবর্তন ঘটবে, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ফলে দেশ জুড়ে এখন অনিশ্চয়তাই সম্বল।