জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের পর হঠাৎই কিছুটা থমকে গিয়েছিল বর্ষা। উত্তর ও মধ্য ভারতের বড় অংশে বৃষ্টি কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছিল গত কয়েকদিনে। তবে স্বস্তির খবর হল, বঙ্গোপসাগরে (Bay of Bengal) ফের নতুন করে ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় হচ্ছে, যার হাত ধরে আগামী কয়েকদিনে দেশজুড়ে, বিশেষত পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বর্ষা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের (India Meteorological Department বা IMD) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই নতুন সিস্টেমের প্রভাব সরাসরি পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের উপকূল ও দক্ষিণাঞ্চলে।
হঠাৎ কেন থমকে গিয়েছিল বৃষ্টি
জুন মাসে ছিল অস্বাভাবিক দুর্বল বর্ষা, শতাব্দীর অন্যতম দুর্বল সূচনা বলেই মনে করছিলেন আবহবিদেরা। কিন্তু জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ছবিটা আচমকাই বদলে যায়। এক থেকে আট জুলাইয়ের মধ্যে সারা দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় বিয়াল্লিশ শতাংশ বেশি বৃষ্টি রেকর্ড হয়, যার প্রধান কারণ ছিল বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা নিম্নচাপ (Low Pressure Area)। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগঢ়, ওড়িশার মতো রাজ্যে ঘাটতি উধাও হয়ে গিয়ে বৃষ্টি রীতিমতো উদ্বৃত্ত হয়ে দাঁড়ায়। তবে সেই সিস্টেম উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে সরে যাওয়ার পর দ্বিতীয় সপ্তাহে ফের দুর্বল হয়ে পড়ে মৌসুমি বায়ু। দিল্লি-সহ উত্তর ভারতের সমতলে ফিরে আসে রোদ ও প্যাচপ্যাচে গরম, কারণ বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে তখন কোনও সক্রিয় ঘূর্ণাবর্ত ছিল না।
নতুন ঘূর্ণাবর্ত
আবহবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে জুলাইয়ের মাঝামাঝি ফের একটি ঘূর্ণাবর্ত (Cyclonic Circulation) তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরবর্তীতে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এই সিস্টেম সক্রিয় হলে তার প্রভাবে জলীয় বাষ্প বেশি পরিমাণে ঢুকবে বায়ুমণ্ডলে, ফলে আগামী আটচল্লিশ থেকে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে উত্তর ভারতের সমতলেও জোরদার বৃষ্টি ফিরতে পারে বলে জানাচ্ছে পূর্বাভাস। একইসঙ্গে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে, যেখানে এখনও বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় চল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানেও এই সিস্টেম কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কী প্রভাব পড়বে
কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ইতিমধ্যেই বৃষ্টির দাপট শুরু হয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবার শহরে ভারী বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় নব্বই শতাংশ, তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করছে ত্রিশ থেকে বত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। আগামী কয়েকদিনও কলকাতায় বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সপ্তাহভর বৃষ্টির সম্ভাবনা পঞ্চান্ন থেকে নব্বই শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে বলেই পূর্বাভাসে ইঙ্গিত মিলেছে। এর আগে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের প্রভাবে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছিল, আর দার্জিলিং, কালিম্পং, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের মতো পার্বত্য ও তরাই-ডুয়ার্স এলাকাতেও ভারী বর্ষণ রেকর্ড হয়েছিল। তবে হুগলি, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো কয়েকটি জেলায় এখনও বৃষ্টির ঘাটতি রয়েই গিয়েছে, নতুন সিস্টেম সক্রিয় হলে সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হতে পারে বলে মনে করছেন আবহবিদদের একাংশ।
মৎস্যজীবীদের জন্য সতর্কতা
বঙ্গোপসাগরে নতুন সিস্টেম সক্রিয় হওয়ার আগে সমুদ্র উত্তাল থাকার সম্ভাবনা থাকে, তাই এই সময়ে মৎস্যজীবীদের গভীর সমুদ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে আবহাওয়া দফতরের তরফে। জুলাইয়ের প্রথম দফার নিম্নচাপের সময়েও ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলে সতর্কবার্তা জারি হয়েছিল, নতুন সিস্টেমেও একই ধরনের সতর্কতা জারি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চাষবাসে প্রভাব
বর্ষার এই আসা-যাওয়া সরাসরি প্রভাব ফেলে রাজ্যের কৃষিতে। জুলাই মাসে ধান রোপণের ভরা মরসুম চলে, তাই সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে চাষিদের সমস্যায় পড়তে হয়। বঙ্গোপসাগরের নতুন সিস্টেম যদি প্রত্যাশিতভাবে সক্রিয় হয়, তাহলে তা রাজ্যের ঘাটতি জেলাগুলিতে চাষবাসের জন্য স্বস্তির খবর হতে পারে। তবে অতিরিক্ত ভারী বৃষ্টির ক্ষেত্রে নিচু এলাকায় জল জমা ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যেমনটা জুলাইয়ের প্রথম দফায় ওড়িশা ও সংলগ্ন এলাকায় দেখা গিয়েছিল।
আগামী কয়েকদিন কী হবে
আবহাওয়া দফতরের শেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণাবর্ত থেকে নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। সিস্টেমটি সক্রিয় হলে তার অভিমুখ ও শক্তি অনুযায়ী রাজ্যের কোন কোন জেলায় কতটা প্রভাব পড়বে, তা স্পষ্ট হবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই। ততদিন পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গে বিক্ষিপ্ত বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি এবং উত্তরবঙ্গের পার্বত্য জেলাগুলিতে ভারী বর্ষণের প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলেই ইঙ্গিত মিলছে।