আকাশপথে যেন এক বিশাল উত্তাল নদী বইছে। মেঘের নদী। ভারতের আবহাওয়া উপগ্রহে (weather satellite) ধরা পড়েছে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। উত্তর ও মধ্য ভারতের আকাশ থেকে শুরু করে হিমালয় (Himalayas) ডিঙিয়ে সোজা চিন পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে ঘন মেঘের এক প্রকাণ্ড বলয় (cloud band)। বিজ্ঞানীদের ভাষায় একে বলা হচ্ছে মৌসুমি অভিসরণ অঞ্চল বা মনসুন কনভারজেন্স জোন (monsoon convergence zone)। আর এই অঞ্চলটাই এখন গোটা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়া বদলে দিতে চলেছে।
কীভাবে তৈরি হল
ঘটনার পিছনে লুকিয়ে আছে সমুদ্র আর আকাশের এক জটিল রসায়ন। ভারত মহাসাগর (Indian Ocean) থেকে ভেসে আসা জলীয় বাষ্পে ভরা বাতাস এশিয়ার বিভিন্ন আবহাওয়া ব্যবস্থা বা ওয়েদার সিস্টেমের (weather system) সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। উষ্ণ জলীয় বাষ্প উপরের ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে জমাট বেঁধে তৈরি করেছে অবিচ্ছিন্ন মেঘের এক লম্বা রেখা। এই রেখা এতটাই দীর্ঘ যে উত্তর ভারত, হিমালয়ের গা বেয়ে একেবারে চিনের ভূখণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি খাত (monsoon trough) সক্রিয় থাকলে এমন লম্বাটে মেঘবলয় তৈরি হয়, অভিমত আবহবিদদের।
বাংলার আকাশে কী প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের জন্য খবরটা সরাসরি প্রাসঙ্গিক। কারণ এই ধরনের মৌসুমি অভিসরণ অঞ্চল সক্রিয় থাকলে তার আঁচ এসে পড়ে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ (Gangetic West Bengal) ও সংলগ্ন এলাকাতেও। বঙ্গোপসাগর (Bay of Bengal) থেকে টাটকা জলীয় বাষ্প ক্রমাগত ঢুকতে থাকায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকায় হিমালয়ের গা ঘেঁষা এই মেঘবলয়ের প্রভাব বিশেষভাবে টের পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দক্ষিণবঙ্গেও ঝমঝমিয়ে তুলকালাম বৃষ্টি নামার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে।
উপগ্রহ চিত্র কী বলছে
ইনস্যাট-থ্রিডিএস (INSAT-3DS) উপগ্রহের থার্মাল ইনফ্রারেড ইমেজারিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মধ্য ও পূর্ব ভারতের আকাশ ঢেকে থাকা ঘন মেঘ কীভাবে উত্তর-পূর্ব দিকে বেঁকে হিমালয়ের ওপার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। আবহবিদদের একাংশের মতে, এশিয়ার আবহাওয়া ব্যবস্থা যে কতটা পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে, এই ছবিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ভারতের বর্ষা শুধু ভারতের নিজস্ব ঘটনা নয়, এটা আরব সাগর থেকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল বায়ুমণ্ডলীয় চক্রের অংশ।
বৃষ্টির ঘাটতি মিটবে কি
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারা দেশ জুড়ে বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, এই সক্রিয় মৌসুমি পর্ব তা অনেকটাই পুষিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন আবহবিদরা। জলাধারগুলোর জলস্তর বাড়বে, খরিফ চাষেও মিলবে সুরাহা। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাহাড়ি এলাকায় ধস আর নিচু এলাকায় জল জমার সম্ভাবনা রয়েছে।