ময়ূরী মিত্র
বিষ্ণুপুরে কাজ৷ যাবার পথে গনগনি৷ এখানে নদীপাড় থেকে সূর্যাস্ত অপূর্ব লাগে৷ নদী যাব বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখি, সূর্য দেখছে বৈষ্ণব বৈষ্ণবী৷ রসকলি, গলায় তুলসীর মালা, মুখভর্তি পান৷ চওড়া সিঁদুর সিঁথিতে৷ লাল সিঁদুরের নীচে সাদা চন্দনের টিপ৷ পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছায়া নামছিল ধীরে ….সূর্যের দিকে মুখ করে থাকা পাহাড় আবার অস্তের রঙটি নিয়েছিল৷ মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের ছায়ায় বা আলোয় উজ্জ্বল হওয়া তার নিজের চয়েস মতো৷ বৈষ্ণব তদ্গত হয়ে রোদ ছায়ায় ম ম পাহাড় দেখছিলেন৷ হঠাৎ বৈষ্ণবীর পিঠে হাত রেখে বললেন— আমার হাতের দিকে লক্ষ্য কর৷ আমি পাহাড়ের যে যে অংশগুলো দেখাচ্ছি সেগুলো মনে মনে জোড়৷ রাধাকৃষ্ণ মূর্তি দেখবি৷ কৃষ্ণ পাশে রাধা নিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে! আমি কিন্তু ওঁর আঙুল অনুযায়ী এ পাহাড় ও পাহাড় জুড়েও কোনো কৃষ্ণমূর্তির আদল পেলাম না৷ ঘোর শ্যামবর্ণের বৈষ্ণব তখনো অনিমেষ৷ ঈশ্বরভক্তি কি কল্পনা বাড়ায়! কী জানি!
তবে প্রকৃতিকে যে ঈশ্বর ভাবে সে যে মহামূল্যবান সাহিত্যিক হতে পারে তা বোধহয় আমাদের বিভূতিভূষণ বুঝিয়ে দিয়েছেন৷ চাঁদের পাহাড়ে আলভারেজ যখন মৃত… তখন মনে হয়েছিল… এই যা! কী করবে এবার শঙ্কর! চাঁদের পাহাড়ে যেতে গিয়ে মরে যাবে না তো! ধীরে ধীরে চাঁদের পাহাড় তার নিজের অপার সৌন্দর্য দিয়ে দুহাতে শঙ্করের মৃত্যু সরায়৷ ও পাহাড় কৈশোর থেকে আজ, আমার কাছে ঈশ্বর হয়ে আছে৷ অথচ কী আশ্চর্য! জীবনে চাঁদের পাহাড় দেখেননি লেখক! প্রথমে বুঝতাম না কী করে তবে আঁকলেন চাঁদের পাহাড়ের মনোমোহিনী ছবি৷ পরে বুঝেছি, বিভূতির প্রকৃতিপ্রেম তাঁকে প্রকৃতির অন্তর বুঝতে শিখিয়েছে৷ বিভূতির প্রকৃতিপ্রেম তাই তাঁর নিজস্বদেব গাথা! নদীর ধারে অনেকক্ষণ বসে রইলাম৷
অস্তকাল যত কাছে আসছে, মাছ লাফ দিচ্ছে নদী জুড়ে৷ ছোট লাফ বড় লাফ৷ এক একটা লাফে টুকরো টুকরো রূপো ঝিলিক পাড়ছে! কে জিতবে! সূর্যের সোনা না মাছের পিঠ!— আদিবাসী দুই বাচ্চা নিজেদের মধ্যে বাজি লড়ে নিল৷ প্রকৃতির মধ্যে থাকে এখানকার স্থানীয় শিশুদের নিরীক্ষণ জোরালো৷ পিছন থেকে উত্তর এল— খেলা যখন আলো নিয়ে, যে আলো দেখতে চাইছে জিত তার হল! বা জিত না হলেও সাধমতো আলোমাখা তার হল! বৈষ্ণব তাঁর ততোধিক কালো বউ নিয়ে কখন যে নদীর কোলে এসে দাঁড়িয়েছেন দেখিনি৷ যখন চলে আসছি তখনো একজন জলের ফসলের সূর্য খাওয়া দেখেই যাচ্ছেন৷ আরেকজন তাঁর দেখাকে দেখছেন৷ বরের চোখে বউয়ের মণি৷ মনে হল, কালো রাধা হারজিতের নিষ্পত্তি চায় না৷
২. পাঁচমুড়া গ্রাম
এ গ্রামে প্রতি গৃহ শিল্পমন্দির, প্রতি গেরস্ত শিল্পী ৷ স্বামী ও স্ত্রীরা একসঙ্গে টেরেকোটার মূর্তি বানান ৷ এক বউকে মজা করে বললাম -আপনারা এ কাজ করে পুরুষদের সমান টাকা পান তো !মাটিমাখা বরকে দেখিয়ে বউ বললে – হাতী বানাতে একজন পেট একজন দাঁত গড়ি ৷ কোনটায় বেশি খাটনি ,বেশি চিন্তা লাগে মাপিনি তো ৷ শুধু বুঝি , শীতের বাতাসে শক্ত হয়ে যাওয়া মাটি জল দিয়ে মাখতে দুজনের আঙুলই শিরশির করছে ৷ জিজ্ঞেস করলাম— শীতকালে রাতে কাজ করেনই বা কেন? বর বলে, রাতে তৈরি ভিজা পুতুল সকাল থেকে পূর্ণ রোদ পায় দিদি!— আঙুল ঠাণ্ডা কাদায় জমে গেলে কী করেন?— তেল টেল মাইখ্যে লি৷ বর্ষায় তো তাহলে আর কষ্ট গো তুমাদের? দুজনেই হেসে মইরল— বর্ষায় মাটি গলে জল হয়, শীতে মাখা মাটি শুকনা হয়ে ঝুরঝুর! মাটি লিব তো মাটিও একটু আধটু চিমটি দিব্যেক! তিনজননাজুক হাসি… কে আবার! দুই শ্বশুরও শিল্পী ছিল৷ ছেলে মেয়ে শিল্পী৷ তাদের ছানারা কলকাতায় পড়ে৷ আশা— ব্রিটিশ যুগের গ্রামীণ মানুষদের মতো এইসব তরুণ কূলগত বৃত্তিবন্ধন ত্যাগ করে কলকাতায় মাছিসমাজ গড়বে না৷ বন্ধু হয়ে যাচ্ছিলাম গল্পে গল্পে৷ বন্ধুত্বে দূর থেকে উপদেশ দেওয়া চলে না৷ বউয়ের হাত ধরে বললাম— আঙুলে তেল মাখায় কে? নাজুক হাসি… কে আবার!
৩. দুদিনের কাজ সেরে যখন শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে গিয়ে বসলাম, ঠিক তার উল্টোদিকে বিরাট অশ্বত্থ৷ একটা গুঁড়ি মোটা হয়ে হয়ে মূল গাছ থেকে ঝুলে মাটি ছুঁয়েছে৷ সেই অর্ধবৃত্তে বসে একটি লোক আর তার বউ৷ বউটির আটপৌরে শাড়ি, হাতে চপ-মুড়ির ঠোঙা৷ চপ তখনও গরম, কারণ ঠোঙা দেবে যায়নি৷ দুপুরেও গরম চপ-মুড়ি বাঁকুড়ার মানুষের প্রিয় খাদ্য৷ ভদ্রলোকের গোঁফজোড়া ঠোঁটের নীচের অংশে পেজাপতি হয়ে গেছে৷ তাতে দুটো মুড়ি, চপের তেল৷ ভদ্রলোক খাবে না, বউটাও মুখে গুঁজে দেবে৷ বর জেনেও হেসে ফেলে বললাম— মাসি, উনি কে? বলি কাকে এতো যতন করে খাওয়াচ্ছ গো? অনেকদিন বাদে গ্রাম্যসুরে কথা বলতে ভালো লাগছিল৷ পাহাড়, গাছ, নদী আর পাহাড়ের একদল পাথরশিল্পী আমাকে গ্রামীণ করেছিল৷ বউও হেসে উত্তর করলে— উ মোর অমিতাভ বচ্চন গো৷ দাঁড়াও না কেনে? দিদিকে একবার হাইট ট দিখাঁইয়ে দাও! উঠলেন৷ ছ ফুট তিন ইঞ্চি৷ মিলিটারে চাকরি করতেন৷ মিলিটারিতে অবসর তাড়াতাড়ি মেলে৷ তাই দেশে ফিরে স্কুল মাস্টারি করছেন বছর সাতেক৷ অবাক হলাম— মিলিটারির পর স্কুল টিচার কেনে? দুইটাই তো উল্টো দাদা৷ আমার ভুলভাল বাঁকড়াই ভাষায় একটুও ভুরু না কুঁচকে প্রাক্তন মিলিটারিম্যান বললেন— উল্টো হব্যেক কেনে? একটায় ভূমি বাঁচাই, আর একটায় মানুষ বাঁচাই৷ ভূমি বাঁচানোও মানুষের জইন্য, আর ছাত্র পড়ানো মানুষ তৈরির জইন্য৷
সত্তর বছরের বরের কাজে ষাটের বউ গব্বে ফাইটছেন৷ মিলিটারির কথার মাঝেই ঝাঁক মেরে বললেন—দিদিকে বল এ কাজে পয়সা নাও না৷ বল…বল… মিলিটারি বর দেখি, খুব লজ্জা পাচ্ছেন৷— হ্যাঁ গো মাসি৷ আমার বাবা ইখানকার যে কটা গাঁয়ে পাথরের কাজ হয়, সি সব গাঁয়ের বাচ্চাদেরকে বিনা পয়সায় পড়ায়৷ পিছন থেকে অভিষেক বচ্চনের পাদপূরণ৷ বাবার মতোই লম্বা৷ তিনিও শিক্ষক৷ তবে পূর্ণ সময়ের এবং গ্রামের সরকারি স্কুলের৷— শিল্পীদের বাচ্চাদের কেন পড়ান বেছে বেছে৷ বাবার উত্তর—পাথর খোদাই কইরত্যে গিয়া বুকে গুঁড়া জমে গো বাপেদের৷ জোয়ান বয়সেই মইরে যায় কতগুলো৷ কতগুলা ধোঁকে কাশ তুইলতে তুইলতে৷ বাপ তো আমি৷ বাচ্চাগুলান যাতে পাথরের কাজে না যায়, তাই পড়ালিখ্যায় আটকে রাখি৷ শ্রদ্ধা জন্মাচ্ছিল ভদ্রলোকের প্রতি৷ সমান শ্রদ্ধায় সীমান্তরক্ষকের বউ ছেলে আর ছেলের বউ দেখি, তাকিয়ে আছে৷ স্তব্ধতা ভেঙে ছুটে আসছে ঝুমঝুম৷
একটি গোলাপী সোয়েটার পরা বাচ্চা মেয়ে, পায়ে নুপুর৷ বুঝলাম নাতনী৷ পাঁচজনে এসেছিলেন পাহাড় বেড়াতে৷ এখন বাড়ি ফিরবেন৷— আপনাদের বাড়ি তো পাহাড়ের কাছে৷ তাও এখনো টুরিস্টের মতো বেড়াতে আসেন?— ই পাহাড় জন্মকাল থেকে দেখছি৷ আগে ঘরের কাজের জল পাহাড়ের ঝোরা থেকে বয়ে লিয়ে যেত মা৷ মিলিটারির সঙ্গে ধূলিপায়ে এলাম মায়ের কাছে৷ ক্ষীর করবে তাও ঝোরার জল৷ ইখন চারদিকে কল আর কল, পাম্প, ট্যাঙ্কি৷ তাই পাহাড়কে বইলতে আসি, কেমন আছিস রে শুশুনিয়া? আমার বয়সী বাঁকুড়ার সব মেয়ে বউ পাহাড়ের সঙ্গে কথা বইলত! আঙুলের ডগায় চপের শেষ তেল চাটতে চাটতে বাঁকুড়ার বউয়ের পাহাড়চারণ চলছে৷ শব্দগুলো ছোট্ট খরগোশ হয়ে এধারওধার ছুটছে৷ সবাই নেমে যাচ্ছি… হঠাৎ জীবনকে সুখ দুখের সাদাভাবে ভাগ করার বদামিটা চাগাড় দিয়ে উঠল৷ চেঁচালাম—আপনারা খুব সুখী থাকেন সবসময়? পাহাড় নদী পাথর নিয়ে?
নির্বোধের প্রশ্নের জবাবে নতুন জীবন এল… ঘাড় ঘুরিয়ে বউ বলল— উ ছেলে যখন পেটে, পেট ভর্তি জল। প্রথম মা হব, ছেলের হাত পায়ের নাচন টের পাই না৷ ছেলে তখন পেটের মধ্যে সাঁতার দেয়৷ হয়ত সদ্য ফোটা নাক বন্ধ হোয়্যে আসে৷ মিলিটারির কাছে কাঁদি…— আমি তখন ছেলের মাকে বললাম এতো গপ্প পাহাড়ের সঙ্গে৷ ইখন তাকে বল তুমার পেটের জলগুলা বাঁকুড়ার রুখু মাটিতে ছিটায়ে দে… বলতে বলতে মিলিটারির হাসি৷ এতো উচ্চ হাসি, যুদ্ধের ডাক শোনা যায়… লড়াইয়ে তৃতীয় অনুভব৷ জীবন এখানে দ্বি -বিভক্ত নয়৷