সোমনাথ মজুমদার
কাল এসে পৌঁছেছি জাপানের টোকিও শহরে। মালয়শিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে কুয়ালালামপুর এসে ওখান থেকে তিন ঘন্টা যায় লে ওভার কাটিয়ে আবার বিমানে চড়ে সাত ঘন্টায় টোকিও এলাম। প্রায় একই সঙ্গে ছেলে ও বৌমা ভ্যাংকুবার থেকে ও ওসাসুর শাশুড়ি মুম্বাই থেকে এসে পৌঁছেছে। থাকবো মোট সাতদিন। তার পর আবার যে যার গন্তব্যে চলে যাবো। বড়ো অদ্ভুত এই সফর।
জাপান সমন্ধে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে জাপানি যুদ্ধ বিমান হানায় ধংস হয়ে যায় পার্ল হারবার নৌ ঘাঁটি। এর ইতিহাস সকালের জানা। এর পর স্থল পথে সুদূর তাইওয়ান, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, বার্মা হয়ে উত্তর পূর্ব ভারতের উপকন্ঠে মিজোরাম, মনিপুরে নেতাজি সুভাষ বসুর সৃষ্টি আজাদ হিন্দ ফৌজকে যুদ্ধ বন্দি ও হালকা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল যে দেশ সেই দেশেই আমেরিকা পারমাণবিক বোমা ফেলে নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করিয়েছিলো। সেই দেশ কে জানার উৎসাহ দীর্ঘ দিনের। আশি-বিরাশি বছর আগে সুদূর রেঙ্গুন মাগওই বিমানঘাঁটি থেকে মিড্ এয়ার রিফুয়েলিং ছাড়া ১০০০ কিলোমিটার উড়ে এসে আবার ফিরে যাওয়া এখন কেমন আশ্চর্য মনে হয়। জাপানের নারিতা এয়ারপোর্ট থেকে টোকিও শহরের প্রাণকেন্দ্রে আমাদের হোটেলের ভাড়া প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা। বলাই বাহুল্য জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যায়বহুল দেশগুলির অন্যতম। যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি দেশ কীভাবে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। ভারী শিল্প, ইস্পাত, ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার সায়েন্স, ওষুধ, চিকিৎসাশাস্ত্র, গবেষণা থেকে শুরু করে খেলাধূলা, শিল্পসংস্কৃতি সব কিছুতেই পৃথিবীর সেরা। দু’দিনে যেটুকু দেখে বুঝেছি তীব্র দেশপ্রেম, সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রমী এদেশের মানুষ জাপানকে সেরা দেশের তকমা লাগিয়াছে।
আজ আমরা যাবো ফুজি মাউন্টেন হয়ে কোয়াগুচিকো লেক দেখে ঐশী ফ্লাওয়ার গার্ডেন যাবো। সকালেই গাড়ি নেওয়া হাজির তানজিং উহমত। হাসিখুশি যুবতী মেয়েটি হাত জোর করে বাঙালি কায়দায় বলে গুডমর্নিং নমস্কার। সে পরে আছে যেমন ইয়েলো কালারের স্কার্ট। চোখে রোদচশমা। আজকাল প্রায় সব হোটেলেই কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয়। পরিমানে এতটাই বেশি এত রকম খাবার যে সব কিছু খেলে সারা দিন আর তেমন ক্ষিধে পায় না। এটা বিদেশে বা ভারতের অন্য রাজ্যে নেই আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গের অনেক হোটেলে চালু করেছে। জাপানি মেয়েটি গাইড চুঁ ড্রাইভার। নাম তাকুনা উচিতা। ফোর বাই ফোর লেন রাস্তা। দু’পাশে সবুজ গাছে ভরা। মোট ১৫৫ কিলোমিটার দূরত্ব। ঘন্টা দেড়েক চলার পর তাকুনা আমাদের ডান দিকে তাকাতে বলে আর দেখা যায় ঝকঝকে নীল আকাশের কোনে মাউন্ট ফুজি। ও বলল তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। কারণ প্রায় সাত দিন একটানা মেঘ ছিল। কিছু দেখা যাইনি। আজ তোমাদের ভাগ্য ভালো। খানিক যাবার পর বাঁ দিকে ঘুরলাম। এই দিকে রাস্তা সরু ঘন পাইন, ম্যাপেল, ওক আর চেরি গাছের জঙ্গল। রাস্তার দু’পাশে বোল্ডার। বা দিকে খাড়া পাহাড়। এক জায়গায় গাড়ি থামে। এখান থেকে ভিউ পয়েন্ট যেতে হবে। ফুজি মাউন্টেন ভিউ পয়েন্ট দেখবার দুটো রাস্তা আছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায়। বেশ খাড়া। অনেকটা পিন্ডারী গ্লেসিয়ার ট্রেকিং করার মতো। আর আছে রাস্তা। সুন্দর ঘোরানো রাস্তা জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। এই পথেই আমরা গেলাম। সার্টার সৌন্দর্য অসাধারণ। বহু বিদেশি পর্যটক ভিউ পয়েন্টের দিকে যাচ্ছে। এদের বেশি ভাগ আমেরিকান, জার্মান, ব্রিটিশ, কানাডিয়ান, ফ্রেঞ্চ আর আছে চাইনিজ। ভারতীয় পর্যটক নেই। সামনে চুরেইতো প্যাগোডা। এই প্যাগোডার পাস দিয়ে মেঘমুক্ত আকাশে মাউন্ট ফুজি কে দেখে মন ভোরে গেলো। এই প্যাগোডার পাস দিয়ে মেঘমুক্ত আকাশে মাউন্ট ফুজিকে দেখে মন ভোরে গেলো।
জোরে বাতাস দিচ্ছে। ঝড়ো বাতাস। তানজিন বলে ফুজি বহুকাল আগে জীবন্ত অগ্নগিরি ছিল। মাথাটা ভাঙা। তার ওপর কিছুটা বরফ আছে বলে এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সকলে সেলফি তুলছে। কেউ কেউ ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছে। বসে রইলাম পাহাড়ের ধারে। অনেক ক্ষণ বসার পর দেখি তানজিন তাড়া দিচ্ছে। আরও অনেক জায়গায় যেতে হবে। আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। চারিদিকে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলে গাড়ি। তানজিন ইংলিশ বোঝে না। জাপানিরা কেউ ইংলিশ বোঝে না। শেখবার চেষ্টাও করে না। ওদের নিজের ভাষাকেই প্রাধান্য দেয়।
কোয়াগুচিকো লেকের ধারে গাড়ি এসে থামলো। এখানে বোট রাইড আছে আবার রোপওয়ে রাইডও আছে। তবে সব কিছুতেই টিকিটের মূল্য আকাশছোয়া৷ চারিদিকে পাহাড় ঘেরা লেকের মাঝখান দিয়ে লঞ্চ চলেছে। ভেতরে জাপানি যুবতী হাতে স্প্যানিশ নিয়ে জাপানি লোক সংগীত গাইছে। লঞ্চ সাজানো বেলুন, ফেস্টুন। বর্ণাঢ্য উৎসবের পরিবেশ। লঞ্চের ডেকে বসে ওপর বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছি মাউন্ট ফুজি। অসাধারণ! চারপাশের প্রকৃতি আরও সুন্দর। সবুজ গাছপালা দিয়ে মোড়া পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের সারি আকাশে মিশেছে। লঞ্চ একঘন্টা পনেরো মিনিট পরে জেটিতে ফিরল। লেকে প্রচুর স্পিডবোট, মোটর বোট, পালতোলা নৌকা চলছে। এবার তানজিং নিয়ে যায় রেস্টুরেন্টে। পাহাড়ের ঢালে রেস্টুরেন্ট। সুন্দর রুম ফ্রেশনারের গন্ধে মো মো করছে চারিদিক। সেদ্দ পমফ্রেট, ঝিনুকের মাংস, ডিমের পোচ, লেটুস পাতা আর শাক দিয়ে সেদ্দ সুপ্, টাটকা ফলের জুস আর কনডেন্স মিল্ক।
এখান থেকে আমরা চললাম ঐশী ফ্লাওয়ার গার্ডেনের কাছে। আমরা এসেছি এপ্রিল মাসের শেষ দিকে। জাপানে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে চেরি ব্লসম হয়। চারিদিকে চেরি ফুলে ভোরে যায় মার্চ মাস তা থাকে এপ্রিলে কমতে থাকে। এপ্রিলের শেষে একদম কমে যায়। মে মাসে আর থাকে না। লেকের ধারে ঐশী গার্ডেনে ঢুকে দেখলাম নানা ফুলের সমারোহ। কিছু ফুলের রং এতো সুন্দর চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না। এই লেকের এক কোনায় দেখা যাচ্ছে ফুজি মাউন্টেন। তবে বিকেলের দিকে মেঘে ঢেকে গেছে। সামনে একটা হ্যান্ডিক্রাফট শোরুম জাপানি হস্তশিল্প কিছু কিছু কিনতে পাওয়া যায়।
গাড়ি চলতে থাকে। পরের দিন সুযোগ হলো ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট দেখতে যাওয়ার। এন্ট্রি টিকেট ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় আড়াই হাজার টাকা। আমাদের এখানে একাডেমি অফ ফাইন আর্ট এ রবীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, নন্দলাল বোস, অবনীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়ের যে কালেকশন রয়েছে তার এন্ট্রি টিকেট কুড়ি টাকা। তবে টাকার ব্যাপারে যাচ্ছি না। মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম দেখার মতো। অবাক হয়ে গেলাম ভেতরে গিয়ে। অন্ধকার। কেবল পেইন্টিংয়ের ওপর ওয়াল মাউন্টেড লাইট জ্বলছে। ভেতরে কেন শব্ধ নেই। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ জাপানীস চিত্রকলা দেখে গভীর ভাবে উদ্ভুদ্ধ হয়েছিলেন। পাঁচ বার এসেছিলেন জাপান৷ প্রথম এসেছিলেন ১৯১৬ সালে। নিসর্গ প্রকৃতি, মুখাবয়ব তাকে গভীর ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। জীবনের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায় উজ্জ্বল জলরং-এ আঁকা মুখ, নিসর্গ মনে করিয়ে দেয়। তোমি কৌরা রবীন্দ্রনাথের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন। ওকাকুড়া টেনসিংয়ের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব শান্তিনিকেতনে জাপানি কোলা শিল্পের ক্লাস শুরু করেন।
ছবির বেশিভাগই জলরঙে আঁকা। কিছু চারকোল পেইন্টিং আর অয়েল পেইন্টিং ও আছে। সব কিছু ছবির মধ্যে নিসর্গ প্রকৃতি, আধ্যাতিক চেতনা বোধ স্পষ্ট। প্রচুর জাপানীস মাস্টার ডিগ্রী, ডক্টরেট করছে তারা ভালো ভাবে এই সব কাজ দেখছে। আলাপ হলো মুচিতা স্বাগতার সঙ্গে। নিজেই এসে আলাপ করলেন। রাণীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়ের আঁকা ওর ভীষণ প্রিয়। সত্যজিৎ রায়ের স্কেচ ভীষণ ভালো লাগে। কলকাতায় যাবার আছে। চারঘন্টা ছিলাম। প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী এই সব ছবি মন দিয়ে দেখছে। এই রকম এক পোস্ট ডক্টেটরেক্ট স্টুডেন্ট ম্রিকা সুমতোর সঙ্গে আলাপ হল। রবীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, সত্যজিৎ রায়ের গভীর অনুরাগি। সামনের বছর কোলকাতায় যাবেন তিনি। বেরিয়ে এসে দেখলাম সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে। কোনও রেস্টুরেন্টে একটু চা খেয়ে আবার হোটেলের দিকে পাড়ি দেওয়া।