বিমলকুমার শীট
মধ্যভারত ভারতের হৃদয়ভূমি নামে খ্যাত। যেমনি তাঁর নাম তেমনি তার মাহাত্ম্য। যুগ যুগ ধরে নানা ঘটনা স্রোত বয়ে চলেছে এখানে। তার সাক্ষী ঐতিহাসিক মন্দির, রাজকীয় দুর্গ, সাঁচি স্তুপ, ভীমবেটকা শৈলচিত্র বিশেষ উল্লেখ্য। এখানে হৃদয়কে স্পর্শ করে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান খাজুরাহোর মন্দির, ৯৮ ফুট উচ্চতার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ধুঁয়াধার জলপ্রপাত, বিস্ময়ের চৌষট্টিযোগিনী মন্দির বিশেষ দ্রষ্টব্য। এবার এই দ্রষ্টব্য স্থানগুলো নিয়ে আলোচনা করব, যা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে ছিল। হাওড়া থেকে এক্সপ্রেস ট্রেনে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। সন্ধ্যায় পৌঁছলাম মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলায় সদর শহর সাতনা স্টেশনে। এখানে স্টেশন সংলগ্ন হোটেলে রাত্রি যাপন করলাম।
পরদিন সকালে উঠে প্রাতঃভ্রমণ সেরে টিফিন খেয়ে খাজুরাহোর উদ্দেশ্যে রিজার্ভ গাড়িতে উঠে পড়লাম। দূরত্ব ১১৬ কিমি, সময় লাগল ২ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট। মাঝে চা পানের বিরতি। বনপথে গড়ি ছুটল। মাঝে গ্রাম অতিক্রম করলাম কিন্তু এখানকার গ্রামগুলো ঘনবসতি কম। বাড়ি ঘরও কম। বনে যে বাঘ রয়েছে পথের বিভিন্ন জায়গায় বোর্ডে ছবি দিয়ে তা পথচারীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বানর আর হনুমান এর লম্ফঝম্ফ দেখতে দেখতে খাজুরাহোতে পৌঁছে গেলাম। টিকিট কেটে এক ধার থেকে মন্দির দর্শন শুরু করলাম।
মধ্যভারতের মন্দির স্থাপত্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন হল চান্দেল্ল রাজাদের নির্মিত খাজুরাহোর মন্দিরগুলি। মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ছাতারপুর জেলার বিন্ধ্য পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত খাজুরাহো একটি শহর। ৯৫০ সালে হতে ১০৫০ সালের মধ্যে জ্যামিতিক নিয়ম অনুসরণে এই মন্দিরগুলি নির্মিত হয়েছিল। বিখ্যাত মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা (ভারতে ভ্রমণকাল ১৩৩৪-১৩৪২) এই মন্দির পরিদর্শন করেন এবং তার ভ্রমণ বৃতান্তে কয়েকজন তপস্বীর উপস্থিতির বর্ণনা করেন। ষোড়শ শতকের মধ্যে খাজুরাহো মন্দির একটি সাধারণ স্থানে পরিণত হয়। খাজুরাহো সুলতান মামুদের আক্রমণের ফলে এবং প্রাকৃতিক কারণে বহু মন্দির আংশিক বা পূর্ণমাত্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও যেগুলি বর্তমানকালেও দণ্ডায়মান তাদের শিখররীতির স্থাপত্য শৈলীর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলা চলে। এই মন্দিরগুলির মধ্যে প্রায় ছয়টি মন্দিরে প্রধান মূর্তি হিসাবে শিব, আটটি বিষ্ণুর প্রতি উৎসর্গীকৃত, একটি করে গণেশ এবং সূর্য দেবতার প্রতি এবং তিনটি জৈন তীর্থঙ্করদের (সন্তদের) প্রতি উৎসর্গীকৃত। মন্দিরগুলিকে দু’ভাগে বিভক্ত করা চলে। এক শ্রেণীতে প্রধান শিখরের সঙ্গে সংযুক্ত একই গঠনের কিন্তু ক্ষুদ্রাকৃতির একাধিক অঙ্গ শিখর এবং অন্য শ্রেণীতে একটি মাত্র নাগর রীতির শিখর। মোটামুটি বামন এবং আদিনাথ মন্দির দুটিকে এই রীতির দুটি উদাহরণ বলা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিখর এবং আমলক, মণ্ডপ প্রবেশদ্বার সংযোজিত অর্ধমণ্ডপ প্রভৃতির মিশ্রণে কাঠামোগুলি নির্মিত। কিন্তু মন্দিরে গর্ভগৃহে সংলগ্ন প্রদক্ষিণপথ (সান্ধার প্রাসাদ) এবং কিছু মন্দিরে (নিরন্ধার প্রাসাদ) সেই ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সান্ধার প্রসাদ৷ অন্যশ্রেণীভুক্ত মন্দিরের মধ্যে দেবী জগদম্বা এবং কুনয়ার মঠ উল্লেখযোগ্য।
এখানে হিন্দু মন্দিরের পাশাপাশি কিছু জৈন মন্দিরের অস্তিত্ব আছে। উল্লেখযোগ্য হল ২৩তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মন্দির। আয়তকার মূল মণ্ডপের চারদিকে ঝুলন্ত বারান্দা। সম্মুখভাগে মণ্ডপ এবং পশ্চাদভাগের সঙ্গে গর্ভগৃহের কোনো সংযোগ নেই। দুই পার্শ্বের প্রাচীরের মধ্যভাগে ক্ষুদ্রকায় কুলুঙ্গী ও তার মধ্যস্থলে ক্ষুদ্র গবাক্ষ। কিন্তু শিবমন্দিরগুলির গঠন প্রকৃতি ও ভিত্তি অলঙ্করণ যত নয়নমনোহর পার্শ্বনাথ বা ওই জাতীয় জৈন মন্দিরগুলির তা নয়। অধিকাংশ কাঠামোই বৈচিত্র্যহীন।
খাজুরাহো মন্দিরগোষ্ঠীর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হল কাণ্ডারিয়া মহাদেব মন্দির। উচ্চভিত্তির উপর কারুকাজ শোভিত এই কাঠামো। এই জাতীয় কাঠামোর মধ্যে কিছুটা ভিন্নধর্মী হল ঘণ্টাই মন্দির। যদিও শেষোক্ত মন্দিরটির কয়েকটি স্তম্ভ ব্যতীত কিছুই অবশিষ্ট নেই। পাশাপাশি দুটি প্রাঙ্গণের মধ্যভাগে এই মন্দিরটি যা অন্যত্র নেই। ওড়িশার মতোই খাজুরাহোর মন্দিরগাত্রকে শোভিত করার জন্য অগণিত মানব মানবীর মূর্তিসহ পশুপাখির মূর্তি নির্মিত করা হয়েছিল। কিন্তু ওড়িশার মতো এখানে এই মূর্তিগুলিকে মন্দিরের কাঠামোর অঙ্গরূপে মনে হয় না। এগুলি মন্দির সংলগ্ন হলেও যেন স্বাধীনভাবে গঠিত। এখানেও মানবশরীরের যাবতীয় ভঙ্গিমাকে যথাযথ রূপ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা দেখা যায়। তবে মন্দিরে মৈথুন মূর্তির সংখ্যাই অধিক এবং এ ক্ষেত্রে ওড়িশার রীতির অনুকরণ না করে প্রাচীন মথুরা ও বেঙ্গির রীতির অনুসরণের চেষ্টা হয়েছে। সব মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মুগ্ধতায় মনপ্রাণ ভরে উঠল। তবে এখানে দু একটি মন্দির ছাড়া বাকি মন্দিরগুলোতে পূজা হয় না।
কিন্তু ধর্মীয় স্থানে মন্দিরে এত মৈথুন মূর্তি কেন এই প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। পর্যটন সঙ্গীরা বারংবার প্রশ্ন করতে লাগল। পণ্ডিতদের এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ তাঁদের কাছে উপস্থাপনা করলাম। প্রথমত, মনুষ্যজীবনের পরম আকাঙ্ক্ষিত সেই জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের প্রতীকরূপে মন্দিরের গায়ে মিথুন ও রতিদৃশ্য উপস্থাপিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মন্দিরের বাইরের দিকে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা কামনাবাসনা, ভোগ বিলাসের জীবন। চিত্ত শুদ্ধ হয়ে এই জীবন উত্তরণ করলে তবেই পাওয়া যাবে ঈশ্বরের সামীপ্য। পার্থিব কামনার পরিতৃপ্তির চেয়ে ঈশ্বর সামীপ্যের আনন্দ অনেক বেশি। তৃতীয়ত, তখনকার দিনের লোকেরা বিশ্বাস করতেন, মন্দিরের গায়ে যৌনদৃশ্য উৎকীর্ণ হলে দেবায়তন অপদেবতা ও বিবিধ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। মন্দিরগাত্রে যৌনদৃশ্যের রূপায়ণ অনেকটা মনুষ্যদেহে কবচ- ধারণের মতো ব্যাপার। চতুর্থত, তান্ত্রিকতা পুষ্ট সমকালীন ধর্মীয় সংস্কারের নিদর্শন এসব দৃশ্য। সবশেষে মন্দিরের বহিরঙ্গে কামকলা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে সমাজে যৌনশিক্ষা প্রচারিত হয়েছে।
এরপর খাজুরাহো থেকে ভিন্ন রাস্তায় পান্না ফরেস্ট অভয়ারণ্য দেখে সাতনাতে ফিরে এলাম। রাত্রে হোটেলে থেকে পরের দিন সকালে ট্রেনে জব্বলপুরে পৌঁছলাম। হোটেলে বিশ্রাম নেওয়ার পরের দিন জব্বলপুর থেকে ২৫-৩০ কিমি দূরে ভেদাঘাটে অবস্থিত ধুঁয়াধার জলপ্রপাত নর্মদা নদীর ওপর অবস্থিত অত্যন্ত দর্শনীয় ও রোমাঞ্চকর স্থান দর্শন করলাম। নর্মদা নদীর তীব্র স্রোতের সঙ্গে ধুঁয়ার মত উৎপত্তি থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে এবং একে প্রায়শই কানাডার নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে। এর আওয়াজ অত্যন্ত গম্ভীর ও জোরালো এবং তা বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়। কাছেই মার্বেল ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, গয়না, হস্তশিল্প ইত্যাদির বিক্রয়কেন্দ্রে ঘুরলাম।
এরপর ১৫০ ধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করে চৌষট্টিযোগিনী মন্দিরে পৌঁছলাম। নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত, এটি দশম শতাব্দীতে কলচুরি রাজবংশের রাজাদের দ্বারা দুর্গা দেবী এবং তার চৌষট্টিজন যোগিনীর উদ্দেশে নির্মিত হয়। মন্দিরটি বৃত্তাকার, এর ব্যাস প্রায় ১৩৫ ফুট ও ছাদবিহীন এবং বৃত্তাকার যোগিনী মন্দিরগুলির মধ্যে বৃহত্তম। চারপাশের দেয়ালে ৬৪টি কুলুঙ্গিতে ৮১টি যোগিনীর মূর্তি রয়েছে। প্রত্যেকের ভিন্ন ভঙ্গিমায় দেখানো হয়েছে। মূর্তিগুলি কালো বেসল্ট পাথর দিয়ে তৈরি। লোককাহিনী অনুসারে, দেবী দুর্গা একটি দানবকে পরাজিত করার জন্য চৌষট্টিজন যোগিনীর রূপ ধারণ করে ছিলেন এবং বিজয়ের পর তার ওই স্থানে মন্দির স্থাপনের অনুরোধ করে ছিলেন। এটি চৌষট্টিযোগিনীর মন্দির হলেও, কেন্দ্রীয় স্থানে অবস্থিত গৌরী-শঙ্কর মন্দিরটি এর অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। বিশ্বাস অনুযায়ী যোগিনীরা আকাশে বিচরণ করে, তাই তাদের মন্দির সাধারণত ছাদহীন। মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মন্দিরটি আক্রমণের শিকার হয়। মন্দিরটির মুল কাঠামো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও এর অভ্যন্তরীণ ভাস্কর্য ও মূর্তিগুলি ধ্বংস
করা হয়।
চৌষট্টিযোগিনী মন্দির দর্শনের পরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামলাম। সেখানে দু-একটি শিবমন্দির দেখলাম। কিন্তু অতীতে এটি জৈন মন্দির ছিল বলে মনে হয়। তারপর সাদা মার্বেল রকে নেমে এলাম। এই স্থানে নর্মদা নদী প্রায় ১০০ফুট উঁচু মার্বেল পাথরের পাহাড়ের গিরিখাত দিয়ে প্রবাহিত। গিরিখাতটি লম্বায় প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ঘাটেই মাঝিরা নৌকা নিয়ে উপস্থিত। আমরা জনা দশেক টিকিট কেটে এতে উঠলাম। নৌকা ১০/২০ মিনিট চলার পর মাঝিরা গান ধরল, তা তাদের জীবনে নানান মজার ঘটনা নিয়ে। তা আমাদের বেশ আনন্দ দিয়েছে। ঘণ্টা দেড়েক নৌকায় কীভাবে কেটে গেল বোঝা গেল না। আনন্দে মনটা ভরে গেল। নৌকা থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে দু’ধারে দোকানদারি দেখতে দেখতে উপরে উঠে এলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে গাড়িতে উঠলাম।
এখান থেকে গাড়িতে উঠে পৌঁছে গেলাম ১৩ কিমি দূরে তেওয়াগে ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরে। একাদশ শতাব্দীতে কলচুরী রাজবংশের রাজত্বকালে এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। এটি জাগ্রত শক্তিপীঠ, কষ্টিপাথরে নির্মিত দেবীর মূর্তি স্বয়ং এখানে আবির্ভূতা হয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। নবরাত্রির দিন হওয়ায় সেদিন খুব ভিড় হয়েছিল। দূরে গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে দেবী দর্শন করে ছিলাম। হিন্দু ধর্মের শাক্ত শাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরাধনা স্থল এই পীঠ। ফিরে এলাম জব্বলপুরে। তারপর ট্রেনে বাড়ি ফিরে এলাম। নিয়ে এলাম বহু মনোমুগ্ধকর স্মৃতি।