আন্দামান: সাগরী দ্বীপমালার দিনলিপি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত

প্লেনটা যখন ধীরে ধীরে আকাশে ডানা মেলল, তখন মনে হল বুকের ভেতরেও যেন আরেকটি অদৃশ্য পাখি ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে। এবারের গন্তব্য— ভারতের শেষ প্রান্তের সেই নীল সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপমালা, আন্দামান। বহুদিন ধরে গল্পে, বইয়ে, ছবিতে যার কথা পড়েছি, দেখেছি, আজ সেই সাগরঘেরা ভূখণ্ডকে নিজের চোখে দেখার সুযোগ। বুদ্ধদেব গুহর একটা বই ছিল দুই বুড়োর কাহিনী যাতে দুই বুড়োর দ্বীপ কিনে আন্দামানে বসবাস নিয়ে একটা খুব সুন্দর গল্প | আমাদের আজকের ভ্রমণ সত্তর-ঊর্ধ্ব দুই বুড়ি অর্থাৎ আমার মা এবং শাশুড়িমাকে নিয়ে আন্দামান সাগরদ্বীপের আনাচকানাচ ঘোরার মিষ্টি কাহিনী |

আকাশের জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখছিলাম অসংখ্য সবুজ দ্বীপ ছড়িয়ে আছে নীল সমুদ্রের বুকে। যেন সমুদ্র তার অগাধ জলরাশির উপর মণিমুক্তোর মতো সাজিয়ে রেখেছে এই দ্বীপগুলোকে। সেই গল্পটাতে পড়েছি প্রায় ৫৭২টি দ্বীপ নিয়ে এই সাগরিকা দ্বীপপুঞ্জ যার আটত্রিশটিতে মানুষ বসবাস করে | পোর্ট ব্লেয়ারে পৌঁছে গাড়ি নিয়ে এলাম শহরের এক হোটেলে। ছোট্ট, পরিচ্ছন্ন শহরটি প্রথম দেখাতেই মন জয় করে নেয়। সাজানো রাস্তা, দূরে নীল সমুদ্রের রেখা, আর বালির তটভূমি— সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতি ও মানুষের মিলিত এক নীরব সৌন্দর্য।


পরের দিন আমাদের প্রথম গন্তব্য চ্যাথাম শ মিল— কাঠ, শ্রম ও ইতিহাসের এক অবিচ্ছিন্ন মিলমিশের আঘ্রাণ নিতে |

পোর্ট ব্লেয়ারের কাছেই ছোট্ট একটি দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন করাতকল— আকারে ছোট, কিন্তু ইতিহাসে বিশাল। চারপাশে সমুদ্র, বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ, আর দূরে দুলতে থাকা গাছগুলো যেন অতীতের অজস্র গল্প বলে যাচ্ছিলো |

১৮৮৩ সালে ব্রিটিশরা এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিল চ্যাথাম শ মিল, যা আজও এশিয়ার প্রাচীনতম চালু করাতকল হিসেবে পরিচিত। যদিও এর ইতিহাসের সূত্র আরও পুরনো—১৭৯৩ সাল থেকেই ব্রিটিশরা আন্দামানে বসতি স্থাপনের চেষ্টা শুরু করেছিল।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পরে আন্দামানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেলুলার জেলের বহু বিপ্লবী বন্দিকে এখানে কাঠ কাটার কাজে লাগানো হতো। শাস্তি ও শ্রমের নির্মম সেই অধ্যায় আজও যেন এই করাতকলের দেয়াল জুড়ে অদৃশ্য হয়ে লেগে আছে।

আন্দামানের অরণ্য থেকে আনা বিশাল গাছের গুঁড়ি এখানে কাটা হতো, প্রক্রিয়াকরণ করা হতো। সেই কাঠ দিয়েই তৈরি হতো প্রশাসনিক ভবন, জেটি, কারাগার— ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের ভিত্তি।
কাঠ পরিবহনের জন্য বসানো হয়েছিল ছোট একটি রেললাইন, যাতে স্টিম ইঞ্জিন চলত। একসময় সেই শব্দে মুখর ছিল পুরো দ্বীপ।

আজও মিলের ভেতরে ঢুকলে কাঠের গন্ধে যেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত ঘ্রাণ মিশে থাকে।
প্রবেশপথে টিকিট দেখিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি সংরক্ষিত ডলফিনের মমি— কাঠের গুঁড়ো দিয়ে স্টাফ করা এই সমুদ্রপ্রাণীটি যেন দর্শনার্থীদের নীরব অভ্যর্থনা জানায়।

ভেতরে সাজানো রয়েছে কাঠের আসবাব, ভাস্কর্য এবং নানা শিল্পসামগ্রী। এক পাশে বড় বোর্ডে বিভিন্ন কাঠের নমুনা, তাদের গুণাগুণ ও ব্যবহার। জাদুঘরের নিস্তব্ধ যন্ত্রপাতি আর পুরনো নথিপত্র যেন নিঃশব্দে বলে—
‘মানুষ যত এগোয়, তার ছায়া তত গভীরভাবে মিশে যায় প্রকৃতির অন্তরালে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বোমাবর্ষণে মিলের একাংশ ধ্বংস হয়েছিল। তবু ছাইয়ের মধ্য থেকে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে এই করাতকল— সময়ের এক নীরব সাক্ষী হয়ে।

সিপিঘাট ফার্ম: মশলার সুবাসে সবুজ গবেষণাক্ষেত্র চ্যাথাম শ মিল থেকে আমরা রওনা দিলাম ওয়ান্ডুর বীচের পথে। সেই পথেই পড়ে সিপিঘাট ফার্ম (Sippighat Farm)—প্রকৃতি ও কৃষি গবেষণার এক
সবুজ প্রাঙ্গণ।

পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে, ওয়ান্ডুর রোডের ধারে প্রায় ৮০ একর বিস্তীর্ণ জমির উপর এই কৃষি গবেষণা কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে। এটি পরিচালিত হয় Central Agricultural Research Institute–এর অধীনে। এখানে চাষ হয় নানা সুগন্ধি মশলার গাছ— দারুচিনি, জায়ফল, লবঙ্গ, কালো মরিচ-সহ আরও অনেক প্রজাতি। বাগানের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে বাতাসে ভেসে আসে মশলার মৃদু সুবাস— যেন প্রকৃতি নিজেই এখানে সুগন্ধি ছড়িয়ে দিয়েছে।

সিপিঘাট ফার্ম শুধু কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, বরং আন্দামানের অ্যাগ্রো-ট্যুরিজমের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
পাখিপ্রেমীদের জন্যও এটি এক আকর্ষণীয় জায়গা। মাঝে মাঝেই কানে ভেসে আসছিলো মিষ্টি পাখিরডাক— ওয়ান্ডুর বিচে যাওয়ার পথে এই ফার্মে কিছুক্ষণ থেমে ঘুরে দেখা যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক শান্ত আলাপ। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এখানে প্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চারপাশে দারুচিনি, লবঙ্গের একটা মিশ্রিত সুগন্ধ আর গাছগাছালির অনন্তসবুজ এরপর গেলাম পাখির স্বর্গ চিড়িয়া টাপু— পাখির স্বর্গ ও সূর্যাস্তের নীড়:
চ্যাথাম স মিল থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দক্ষিণে চিড়িয়া টাপু। নামেই যার পরিচয়— পাখিদের দ্বীপ। একসময় ভোরের আলো ফুটতেই বনভূমি জুড়ে শোনা যেত অসংখ্য পাখির ডাক— Treepie, Bulbul, Drongo, Sea Eagle— নানা প্রজাতির পাখি। গাছে গাছে ঢাকা এই অঞ্চল ছিল যেন এক পাখির স্বর্গরাজ্য। ২০০৪ সালের সুনামির পরে এই অঞ্চলের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সমুদ্রতীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কমে গেছে পাখির সংখ্যা। তবু এখানকার ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও বনভূমি আজও এক জীবন্ত পাঠশালা— যেখানে প্রকৃতি ও মানুষ সহাবস্থানের শিক্ষা পায়।

২০০১ সালে গড়ে ওঠা চিড়িয়া টাপু বায়োলজিক্যাল পার্ক এই অঞ্চলকে নতুন পরিচয় দিয়েছে— সংরক্ষণ, গবেষণা ও ইকো-ট্যুরিজমের মিলিত কেন্দ্র হিসেবে।

বিকেলের শেষে সূর্য যখন সাগরের বুকে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল, আকাশ লালচে সোনালি রঙে ভরে উঠছিল। পাখিরা তখন ঘরে ফিরছে, বাতাসে মিশে আছে ঢেউয়ের গন্ধ।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—
‘প্রকৃতি কথা বলে— যদি শোনা যায় তার নীরব ভাষা।’

চিড়িয়া টাপুর অন্যতম আকর্ষণ মুন্ডা পাহাড় ট্রেল— প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এক প্রাকৃতিক পথ।
ঘন সবুজ অরণ্যের ভেতর দিয়ে এই পথ ধীরে ধীরে উঠে গেছে সমুদ্রতীরের এক পাহাড়চূড়ায়। পথে ফার্ন, অর্কিড, বুনো ফুল আর নানা গাছের ছায়া। বাতাসে নোনা গন্ধ, দূরে সমুদ্রের শব্দ।

কোথাও কাঠের সিঁড়ি, কোথাও পাথুরে পথ, কোথাও শুকনো পাতায় ঢাকা মাটি— এই বৈচিত্র্যই ট্রেলটিকে জীবন্ত করে তুলেছে চূড়ায় পৌঁছে দেখলাম আন্দামান সাগরের অসীম নীল বিস্তার। সূর্যাস্তের সময় সেই দৃশ্য এমনই মনোমুগ্ধকর যে মনে হয় আকাশ আর সমুদ্র যেন একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।
মুন্ডা পাহাড় ট্রেল তাই শুধু একটি ট্রেক নয়— এ যেন এক ধ্যানমগ্ন যাত্রা, যেখানে প্রকৃতির নীরবতার মধ্যে নিজের সঙ্গেই নিজের দেখা হয়। ফিরতে ফিরতে গাড়িতে দুই মায়ের আনন্দোচ্ছল গল্প যেন শেষই হতে
চায় না৷

পরদিন যাবার কথা রস আইল্যান্ড— ইতিহাসের নীরব দ্বীপ :
আন্দামান ভ্রমণের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় রস আইল্যান্ড—বর্তমান নাম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দ্বীপ।
পোর্ট ব্লেয়ারের অ্যাবারডিন জেটি থেকে ছোট্ট নৌকায় মাত্র পনেরো মিনিটের পথ। দ্বীপে পা রাখতেই মনেহলো সে সময়ের ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতের মধ্যে ঢুকে পড়েছি।

ব্রিটিশ আমলে এখানেই ছিল আন্দামান প্রশাসনের প্রধান কেন্দ্র। চিফ কমিশনারের বাসভবন, চার্চ, হাসপাতাল, অফিসারদের বাংলো, বেকারি, বাজার— সব মিলিয়ে এটি ছিল এক সমৃদ্ধ প্রশাসনিক শহর।
তখন এই দ্বীপকে বলা হতো ‘Paris of the East’।

আজ সেই শহরের অনেকটাই ধ্বংসাবশেষ। দ্বীপের বালুময় পরিধির মধ্যেই পাথরের রাস্তা, ভাঙা বাড়ির দেয়ালগুলোকে জড়িয়ে ধরেছে বিশাল বটগাছের শিকড়— যেন প্রকৃতি নিজেই ইতিহাসকে বুকে টেনে নিয়েছে। এখানে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল ছোট্ট শহর, সমস্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধাসহ| এখানে রয়েছে ক্লাবহাউস, অফিস বাড়ি, চার্চ, বেকারি এমনকি রেস্ট হাউস পর্যন্ত | সব কিছুই ভাঙাচোরা অতীত সমৃদ্ধির গর্বিত নিদর্শন মাত্র |

দ্বীপের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি লাইটহাউস— সমুদ্রের নীরব প্রহরী। তাঁর পেছন দিয়ে ধাপে ধাপে নেমে গেছে পাথরের সিঁড়ি… ফেডারার বিচ এর দিকে | সমুদ্র এখানে উত্তাল ডুবো পাথরে ভরা কিন্তু যতদূর চোখ যায় ফেনিল জলোচ্ছ্বাস৷

উপরে এসে ছোট্ট চায়ের দোকানে দেখা হল অনুরাধা রাও নামের এক মহিলার সঙ্গে, যিনি বহু বছর ধরে দ্বীপের হরিণ ও ময়ূরদের দেখাশোনা করছেন। একসময় যেখানে মাত্র কয়েকটি হরিণ ছিল, আজ সেখানে কয়েকশো হরিণ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। মানুষ ও প্রাণীর এই মমতার সম্পর্ক দ্বীপটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে |

আন্দামান ভ্রমণ শেষে মনে হয়—এই দ্বীপমালা শুধু সমুদ্রের সৌন্দর্যের জন্য নয়, ইতিহাস, প্রকৃতি ও মানুষের এক গভীর মিলনের জন্যও অনন্য।
সবুজ বন, নীল সমুদ্র আর পাখিদের কিচিরমিচির যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়— আন্দামান শুধু দেখা নয় অনুভব করা যায় প্রাণের অন্তস্থলে বাজতে থাকে সমুদ্রের রিনঝিন৷
বিদায়ের মুহূর্তে তাই মনে হলো এ যেন শেষ নয়, আবার ফিরে আসার এক নীরব আহ্বান৷