কৃত্রিম মেধা (Artificial Intelligence বা AI) নিয়ে চর্চা এমনিতেই তুঙ্গে। তার মধ্যেই নতুন করে হইচই ফেলে দিল ভারতের অন্যতম বৃহৎ তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা উইপ্রো (Wipro)। সংস্থার মুখ্য প্রযুক্তি আধিকারিক (Chief Technology Officer বা CTO) সন্ধ্যা অরুণ জানিয়েছেন, তাঁদের সংস্থায় এআই নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার নানা উদ্যোগের ফলে উৎপাদনশীলতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যা প্রায় ২০ হাজার কর্মীর সম্মিলিত কাজের সমান। বেঙ্গালুরুতে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন।
কী বলেছেন
সন্ধ্যা অরুণের কথায়, এআই ব্যবহারের ফলে যে বাড়তি কর্মক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তার জন্য সরাসরি কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি। বরং সংস্থার ভিতরেই কর্মীদের অন্যান্যা নানা ভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, যাকে রিডিপ্লয়মেন্ট (redeployment) বলা যেতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যা, ধরুন একই ইঞ্জিনিয়ার হয়তো এখন একগুচ্ছ এআই এজেন্ট (AI agent) পরিচালনা করছেন, অথবা অন্য কোনও প্রকল্পে বদলি হয়েছেন, কিংবা নতুন কোনও ভূমিকার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এর অর্থ কখনওই এই নয় যে একজন মানুষের জায়গা সরাসরি একটি এআই এজেন্ট নিয়ে নিচ্ছে।
জুন মাসের হিসেব অনুযায়ী উইপ্রোয় কর্মী সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ ৪৩ হাজার। সংস্থাটি এখন ধীরে ধীরে ঝুঁকছে মানুষের সঙ্গে এআই-এর সমন্বিত কর্মপদ্ধতির (human-AI operating model) দিকে। ইতিমধ্যে ১ লক্ষেরও বেশি কর্মীকে উন্নত মানের এআই প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সন্ধ্যা।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বদল
শুধু উইপ্রো নয়, ভারতের প্রায় ৩১৫ বিলিয়ন ডলার বা ৩০ লক্ষ ১১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার অর্থনীতির সফটওয়্যার পরিষেবা শিল্প এখন গোটাটাই এআই চ্যালেঞ্জের মুখে। যার জেরে নিয়োগ প্রক্রিয়া, সফটওয়্যার তৈরির পদ্ধতি এবং ব্যবসায়িক চুক্তির ধরন, সবটাই বদলাচ্ছে। সন্ধ্যা অরুণের এই মন্তব্য কোনও বিক্ষিপ্ত উচ্চারণ নয়। আসলে উইপ্রোর চেয়ারম্যান ঋষদ প্রেমজির গত সপ্তাহেই এমনই একটি বক্তব্য পেশ করেছিলেন। পক্ষান্তরে সেটিই বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন উইপ্রোর সিটিও।
ভারতের বৃহত্তম সফটওয়্যার পরিষেবা রপ্তানিকারক সংস্থা টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (Tata Consultancy Services বা TCS) জুন মাসেই জানিয়েছিল, এআই এজেন্ট ও কর্মীর সংখ্যা সমান করার লক্ষ্যে এগোনোর ফলে নিয়োগের গতি কমবে। টিসিএস প্রায় ৮ হাজার ৯০০ জন ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার (forward-deployed engineer) নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। ইনফোসিসের (Infosys) লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬ হাজার। এই ইঞ্জিনিয়াররা মূলত গ্রাহক সংস্থাগুলিতে গিয়ে সরাসরি কাজ করেন, যাতে সেখানে এআই দিয়ে কাজ করানোর সক্ষমতা দ্রুত বাড়ে। উইপ্রোও নিজেদের এই ধরনের কর্মীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে, যদিও নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ করেননি সন্ধ্যা। তাঁর ইঙ্গিত, সংখ্যাটা প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছাকাছিই থাকবে।
ফলাফলের দিকে জোর
সন্ধ্যা অরুণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু কোন পদে কত জন এআই এজেন্ট কাজ করছে, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর বদলে আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রতিটি ইঞ্জিনিয়ার এআই সিস্টেমের সঙ্গে কতটা দক্ষভাবে কাজ করতে শিখছেন। তাঁর কথায়, উৎপাদনশীলতা থেকে সরে গিয়ে এখন নজর দিতে হবে ফলাফলের দিকে। অর্থাৎ, এআই আদৌ গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নত করছে কি না, নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে কি না এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্যপূরণে সাহায্য করছে কি না, সেটাই এখন থেকে বিচারের মাপকাঠি হওয়া উচিত।
যদিও শীর্ষস্থানীয় চার ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার মধ্যে উইপ্রোই একমাত্র সংস্থা, যারা এআই থেকে কতটা রোজগায় হয়েছে সেই হিসেব প্রকাশ করে না। ফলে স্বাধীনভাবে এই দাবি যাচাই করা কিছুটা কঠিন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কী তাৎপর্য
আপনি যদি তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে কর্মরত হন, বা আপনার কাছের কেউ তা হলে এই খবর আপনার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এআই আপাতত সরাসরি বড় মাপের ছাঁটাইয়ের রাস্তায় না হাঁটলেও ভবিষ্যতে এই প্রবণতা কোন দিকে যায়, তার উপরেই নির্ভর করছে গোটা শিল্পের কর্মসংস্থানের চেহারা।