Explainer: ফোন নম্বর ছাড়া শুধু ইউজারনেম দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে ‘না’ কেন্দ্রের, আপত্তির আসল কারণ জানেন?

Whatsapp Username Ban (AI নির্মাণ)

নতুন কারও সঙ্গে আলাপ হলে ফোন নম্বর দেওয়াটা এখনও অনেকের কাছেই একটু অস্বস্তির। ঠিক এই জায়গাতেই বদল আনতে চেয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp)। ফোন নম্বর না দিয়েও যাতে অচেনা কারও সঙ্গে চ্যাট শুরু করা যায়, তার জন্য গত ২৯ জুন নতুন ইউজারনেম (Username) ফিচার ঘোষণা করেছিল মেটা (Meta) মালিকানাধীন এই সংস্থা। কিন্তু ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি জানিয়ে দিল, ভারতে আপাতত এই ফিচার চালু করা যাবে না।

ঠিক কী বদলে যাওয়ার কথা ছিল

এতদিন হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয়ের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি ছিল ফোন নম্বর। নতুন ফিচারে ব্যবহারকারীরা @ চিহ্ন দিয়ে নিজের পছন্দের একটা নাম বেছে নিতে পারতেন, আর সেই নামেই অচেনা কেউ প্রথমবার যোগাযোগ করতে পারতেন, ফোন নম্বর জানার দরকার পড়ত না। সংস্থার দাবি ছিল, এতে সিম-অদলবদল প্রতারণা বা চ্যাট গ্রুপ থেকে নম্বর হাতানোর মতো সমস্যা অনেকটাই কমত। প্রকাশ্য পরিচিতদের নাম ও তার কাছাকাছি বানান আগেভাগে সংরক্ষণ করে রাখার কথাও জানিয়েছিল সংস্থা, যাতে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরি ঠেকানো যায়।


কেন্দ্রের আপত্তি ঠিক কোথায়

ঘোষণার এক থেকে দু’দিনের মধ্যেই ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক বা মেইটি (MeitY) হোয়াটসঅ্যাপকে আনুষ্ঠানিক নোটিস পাঠিয়ে তিন দিনের মধ্যে বিশদ ব্যাখ্যা চেয়েছে, এবং যতদিন না সরকার সন্তুষ্ট হচ্ছে ততদিন ফিচারটি চালু না করার নির্দেশও দিয়েছে। কেন্দ্রের মূল আশঙ্কা, ফোন নম্বর ছাড়া প্রথম যোগাযোগ সম্ভব হলে অনলাইন প্রতারণা, ফিশিং ও পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। সরকারি সংস্থার নাম বা পরিচিত ব্যক্তিত্বের নামের কাছাকাছি ইউজারনেম বানিয়ে প্রতারণা চালানোর আশঙ্কাও নোটিসে তোলা হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যামের আতঙ্কই কি আসল কারণ

গত দু’বছরে ভারত জুড়ে যে প্রতারণা সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে, তার নাম ডিজিটাল অ্যারেস্ট (Digital Arrest)। সিবিআই, বিচারক বা কাস্টমস অফিসার সেজে ভিডিও কলে ভয় দেখিয়ে টাকা হাতানোর এই কৌশলে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি থেকে সরকারি কর্মী, কেউই বাদ যাননি। ফোন নম্বরের বদলে ইউজারনেমে প্রথম যোগাযোগ শুরু হলে তদন্তকারীদের হাতে থাকা সবচেয়ে জোরালো সূত্রটাই হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সরকার, কারণ সন্দেহভাজন দেশের ভিতরে না বাইরে, সেটা বুঝতেও ফোন নম্বরই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভরসাযোগ্য উপায়।

পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেও এই আতঙ্ক অচেনা নয়। নদিয়ার কৃষ্ণনগরে সম্প্রতি এক বিধবা মহিলার কাছ থেকে পুলিশ পরিচয়ে দুই কোটি টাকা হাতানোর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছিল, ধাপে ধাপে টাকা পাঠানো হয়েছিল ভিন রাজ্যের অ্যাকাউন্টে। এমন ঘটনা বেড়ে চলায় লালবাজারের সাইবার ক্রাইম শাখার অধীনে নতুন সাতটি ইউনিট তৈরির উদ্যোগও নিয়েছে কলকাতা পুলিশ, নবান্নের সবুজ সংকেত নিয়ে। প্রতারণার ধরন যত জটিল হচ্ছে, নজরদারির কাঠামোও তত বাড়াতে হচ্ছে পুলিশকে, ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচার নিয়ে কেন্দ্রের সতর্কতা অনেকটাই যুক্তিযুক্ত বলে মত সাইবার বিশেষজ্ঞদের একাংশের।

টেলিগ্রামের নজির, তবে অমিলও আছে অনেক

কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাকে গত মাসে টেলিগ্রামের (Telegram) উপর ভারতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখাচ্ছে। তবে বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট ছিল একটু আলাদা, নিট (NEET) স্নাতক পুনঃপরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত গুজব ও প্রতারণা ঠেকাতে আইটি আইনের ৬৯এ ধারায় ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, পরে দিল্লি হাইকোর্টও কেন্দ্রের সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। অর্থাৎ কারণ হুবহু এক না হলেও, বার্তাটা স্পষ্ট, বেনামে বা স্বল্প-পরিচয়ে বার্তা বিনিময়ের সুযোগ থাকা যে কোনও প্ল্যাটফর্মের উপরেই নয়াদিল্লির নজর এখন অনেক বেশি কড়া।

হোয়াটসঅ্যাপ কী বলছে

সংস্থার তরফে সাফ জানানো হয়েছে, ইউজারনেম রিজার্ভ করার সুযোগ চালু হলেও তা এখনও পুরোপুরি সক্রিয় নয়, চলতি বছরের বাকি সময়ে ধাপে ধাপে চালু হওয়ার কথা ছিল। প্রতারণা রুখতে একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করার কথাও জানিয়েছে সংস্থা, নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে বার্তা এলে তা আলাদা করে চিহ্নিত করে দেখানো, একই নাম বারবার অনুমানের চেষ্টা আটকানো, এবং আইনি অনুরোধে ইউজারনেমের পিছনের ফোন নম্বর প্রকাশের ব্যবস্থা রাখার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে তার মধ্যে। প্রযুক্তি মহলের একাংশ অবশ্য মনে করাচ্ছেন, টেলিগ্রাম বা সিগন্যালে (Signal) এই সুবিধা বহুদিন ধরেই চালু আছে, ফলে হোয়াটসঅ্যাপের ক্ষেত্রেই কেন এত কড়াকড়ি, সেই প্রশ্নও উঠছে সমান্তরালে। উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট, কারও আশঙ্কা এই ফিচার ঠিকমতো নজরদারি ছাড়া বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, আবার কারও মতে পেশাদারদের গোপনীয়তা রক্ষায় এটা সত্যিকারের সহায়ক পদক্ষেপ।

পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে কেন এই খবর জরুরি

কলকাতা তথা রাজ্যের ছোট শহর, এমনকি গ্রামীণ এলাকাতেও হোয়াটসঅ্যাপ এখন যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম, ব্যবসা থেকে পারিবারিক আলাপ, সবেতেই। এমন একটা ফিচার চালু হলে তার সুফল ও ঝুঁকি, দুটোই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হত রাজ্যের সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেই। আপাতত ফিচারটি থমকে থাকায় স্বস্তি পেলেও, আলোচনা শেষ হয়নি, সরকার ও সংস্থার মধ্যে পরামর্শ প্রক্রিয়া চলছে, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী দাঁড়ায় তার উপরেই নির্ভর করছে ভবিষ্যতে ফিচারটি ভারতে আদৌ কবে, বা কোন শর্তে চালু হবে।