রেকর্ড লাভের গুড় খাচ্ছে AI, মরছেন মেধাবীরা: ১ লক্ষ চাকরি খেয়ে নিল মাইক্রোসফট-ইনটেল

চাকরি খাচ্ছে কৃত্রিম মেধা (AI নির্মাণ)

এটা একটা অদ্ভুত ছবি।

ওরাকল (Oracle)-এর ত্রৈমাসিক নিট মুনাফা ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি ২৭ শতাংশ। গুগল (Google)-এর ক্লাউড বিভাগের আয় ৬৩ শতাংশ বেড়ে ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে, ভবিষ্যতের অর্ডার জমে গিয়েছে দ্বিগুণ। প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। মেটা (Meta), অ্যামাজন (Amazon), মাইক্রোসফট (Microsoft)-এর আয়ের হিসেবে দেখলে মনে হবে প্রযুক্তি শিল্পের এখন সোনার মরসুম।

অথচ এই কোম্পানিগুলোই একসঙ্গে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করছে।


২০২৬ সালে জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বিশ্বের প্রযুক্তি খাতে প্রায় ১,৮৫,০০০ কর্মী কাজ হারিয়েছেন, ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ২৬৭টিরও বেশি সংস্থায়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় হাজারখানেক প্রযুক্তিকর্মী বেকার হচ্ছেন। ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে প্রায় ২,৪৫,০০০ প্রযুক্তিকর্মী ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছিলেন। সেই ধারা ২০২৬-এ আরও দ্রুত হয়েছে।

কারণ একটাই

২০২৬ সালে যত ছাঁটাই হয়েছে, তার ৫৬ শতাংশ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) বা অটোমেশনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, মোট প্রভাবিত কর্মীর সংখ্যা দেড় লক্ষ ছাড়িয়েছে।

ওরাকল সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি থেকে এই বছরের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে মোট ২১,০০০ কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, মোট কর্মীর ১৩ শতাংশ। সংস্থার বার্ষিক নিয়ন্ত্রক ফাইলিংয়ে সরাসরি বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও প্রয়োগ কর্মীসংখ্যা কমানোর কারণ হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও হতে পারে।

অ্যামাজন ২০২৬-এর জানুয়ারিতে ১৬,০০০ কর্পোরেট পদ ছাঁটাই করেছে। এর আগে ২০২৫-এর অক্টোবরে আরও ১৪,০০০। অ্যামাজনের প্রধান কর্মকর্তা অ্যান্ডি জাসি (Andy Jassy) এর আগেই বলে রেখেছিলেন, ‘আগামী কয়েক বছরে এআই থেকে দক্ষতা বাড়বে এবং মোট কর্পোরেট কর্মীসংখ্যা কমবে।’ সেটাই এখন বাস্তব।

মেটা যেমন জানুয়ারিতে রিয়্যালিটি ল্যাবস (Reality Labs) বিভাগ থেকে ১,৫০০ জন ছাঁটাই করার পর মে মাসে আরও ৮,০০০ ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মাইক্রোসফট ৯,০০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা মোট কর্মীর চার শতাংশের কম। ডেল (Dell) তার মোট কর্মীর ১০ শতাংশ, প্রায় ১১,০০০ পদ কাটছাঁট করেছে, ছাঁটাইয়ের ক্ষতিপূরণ দিতে খরচ হয়েছে ৫৬৯ মিলিয়ন ডলার। সিসকো (Cisco) দুই দফায় মোট প্রায় ১০,০০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে। ইনটুইট (Intuit) মে মাসে মোট কর্মীর ১৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৩,০০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে।

মুনাফা বাড়ছে, মাথা গুনছে এআই

এখানেই আসল বিতর্ক।

ওরাকল ২১,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের সময় ত্রৈমাসিক মুনাফা ২৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতের চুক্তির মজুদ ৩২৫ শতাংশ বেড়ে ৫৫৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। সেই অতিরিক্ত রোজগার এআই ডেটা সেন্টারে ঢালা হচ্ছে। সেলসফোর্স (Salesforce)-এর প্রধান নির্বাহী মার্ক বেনিঅফ (Marc Benioff) বলছেন এআই এজেন্ট সাপোর্ট টিমের কাজ নিয়েছে, তাই কম মাথা দরকার। প্যাটার্নটা স্পষ্ট: কর্মী কমাও, এআই বাড়াও, শেয়ারের দাম বাড়াও।

কিন্তু সব ছাঁটাই কি সত্যিই এআই-এর কারণে?

এপিক গেমস (Epic Games)-এর প্রধান নির্বাহী টিম সুইনি (Tim Sweeney) স্পষ্ট বলেছেন, তাঁর সংস্থার ১,০০০ ছাঁটাই এআই-এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, ফোর্টনাইটের (Fortnite) ব্যবহারকারী কমে যাওয়াই কারণ। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন ‘এআই ওয়াশিং’ (AI washing) চলছে, অর্থাৎ পুরনো খরচ কমানোর ছাঁটাইকে ‘এআই-চালিত রূপান্তর’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অ্যাটলাসিয়ান (Atlassian)-এর প্রধান মাইক ক্যানন-ব্রুকস (Mike Cannon-Brookes) স্বীকার করেছেন, তাঁদের পদ্ধতি ‘এআই মানুষ প্রতিস্থাপন করবে’ এমন নয়। কিন্তু এআই দক্ষতার ধরন বদলে দেয়, এটা অস্বীকার করা সততার কাজ হবে না।

সিয়াটলে বাচ্চা, বেলভিউতে লিজ

এই ছাঁটাইয়ের ঢেউয়ে সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় আছেন ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীরা।

আমেরিকার হোমল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের ২০২৬-এর তথ্য বলছে, মোট ৪,০৬,৩৪৮টি এইচ-১বি (H-1B) ভিসার অনুমোদনে ২,৮৩,৭৭২টিই পেয়েছেন ভারতীয়রা, অর্থাৎ মোট এইচ-১বি ভিসার ৭০ শতাংশেরও বেশি। কাজ হারালে মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে নতুন চাকরি না মিললে দেশ ছাড়তে হবে।

একজন লিখেছেন, সিয়াটলে (Seattle) তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া বাচ্চা আছে, স্ত্রী এইচ-৪ (H-4) ভিসায়, বেলভিউতে (Bellevue) আট মাসের লিজ বাকি, আর কাজ চলে গেল রাত ১১টায় ই-মেইলে। ৬০ দিনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। মেটার শেয়ারের দাম অবশ্য সেই গণছাঁটাইয়ের খবরে বেড়েছে।

ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞ রাজীব খান্না জানিয়েছেন, কাজ হারানো এইচ-১বি কর্মীদের ভিসা পরিবর্তনের আবেদনে ফেরত পাঠানো এবং প্রত্যাখ্যান অনেক বেড়ে গিয়েছে। বেঙ্গালুরু (Bengaluru) এবং হায়দরাবাদের (Hyderabad) প্রযুক্তিকেন্দ্রেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। আমেরিকা থেকে ফিরে আসা কর্মীরা দেখছেন, দেশীয় বাজারে বিদেশি অভিজ্ঞতার চাহিদা সব সময় মেলে না, বেতনও অনেক কম।

নতুন চাকরি হচ্ছে, কিন্তু অন্য লোকের জন্য

প্রযুক্তি শিল্পে নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ নেই। কিন্তু যে পদগুলো উঠে যাচ্ছে, সেগুলো হল কাস্টমার সাপোর্ট, কন্টেন্ট মডারেশন, ডেটা এন্ট্রি আর প্রথাগত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট। আর যেখানে নিয়োগ হচ্ছে, সেগুলো হল এআই সেফটি, মেশিন লার্নিং অপারেশনস (Machine Learning Operations) আর মানব-এআই সহযোগিতার নতুন পদ।

নতুন স্নাতকদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরাও ছাঁটাই হয়ে নতুন কাজের বাজারে ঢুকেছেন, ফলে প্রতিযোগিতা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।

শেষ কথা: মুনাফা আর কাজের মিলমিশ কোথায়

ক্যালিফোর্নিয়ার (California) গভর্নর গ্যাভিন নিউসম (Gavin Newsom) সম্প্রতি একটি নির্দেশে এআই-চালিত ছাঁটাই থেকে কর্মীদের সুরক্ষার পথ খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু নীতি এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

কোম্পানির শেয়ারবাজারে দাম বাড়ছে, মুনাফা বাড়ছে, কিন্তু কর্মী কমছে। প্রযুক্তির উৎপাদনশীলতার লাভ কাদের কাছে যাবে? শেয়ারহোল্ডারদের, নাকি সমাজের?

সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও দেওয়া হয়নি। আর আগামীতে সেই উত্তর যে মিলবেই, এমন কোনও গ্যারান্টিও নেই।