কেন বৈভবকে এখনই মাঠে নামাতে চাইছেন না গৌতম গম্ভীর? জেনে নিন তার কারণ

আয়ারল্যান্ডে ভারতীয় দলের টি-২০ সিরিজ হারের পর ভারতীয় ক্রিকেট মহলে ব্যাপক হইচই শুরু হয়ে গিয়েছে। আসলে আইসিসি টি-২০ ক্রমতালিকায় দুই দলের ফারাক এতটাই যে, এই হার মেনে নিতে পারছেন না কোনও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমী। মার্চে টি-২০-র বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারত যেখানে এই তালিকায় এক নম্বরে, সেখানে আয়ারল্যান্ড ১১-য়। সেই আয়ারল্যান্ডের কাছে পরপর দু’টি ম্যাচে হেরে সিরিজ হার হয়তো ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা কালো দাগের মতো রয়ে যাবে।

খেলায় হার-জিত লেগেই থাকে। ভারত যে কখনো কোনোদিন হারেনি, তা তো নয়। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের মতো তথাকথিত দুর্বল দলের কাছে এই ভাবে প্রায় আত্মসমর্পণ করে হার মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টকর। তবে এই হারের কষ্টের পাশাপাশি একটা ক্ষোভও জন্মেছে এ দেশের ক্রিকেট মহলে। এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও কেন এমন একজন ব্যাটারকে দলের বাইরে বসিয়ে রাখা হয়েছে, যাঁকে সারা বিশ্ব ক্রিকেটের নতুন বিস্ময় বালক হিসেবে চেনে।

যিনি মাঠে নামলেই ব্যাটে ঝড় তোলেন, খুব কম ম্যাচেই যাঁর ব্যাট থেকে কম রান এসেছে, সেই বৈভব সূর্যবংশীকে কেন দলের এই দুর্দিনেও দলের বাইরে রাখা হচ্ছে, উঠছে সেই প্রশ্ন।গত দু-তিন দিনে বহু ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন, বৈভবকে যেখানে প্যাড-গ্লাভস পরিয়ে ব্যাট হাতে মাঠে পাঠানো উচিত, সেখানে তাঁকে জল-তোয়ালে দিয়ে মাঠে পাঠানো হচ্ছে কেন? নানা মুণির নানা মত। সুনীল গাভাসকর বলেছেন, ‘আমি তো ভেবেছিলাম আয়ারল্যান্ডে দুই ম্যাচেই বৈভব খেলবে।ইংল্যান্ডে পরীক্ষার আগে ওকে তৈরি ও পরখ করে নেওয়ার সবচেয়ে ভাল সুযোগ ছিল এটাই।’


এই প্রসঙ্গে গাভাসকর বলেন, ‘সঞ্জু স্যামসন বা অভিষেক শর্মার সঙ্গী হিসেবে ওকে ওপেন করতে পাঠানো উচিত ছিল। এই অবস্থায় ইংল্যান্ডে প্রথম টি-২০ ম্যাচেই ওকে খেলার সুযোগ দেওয়া উচিত। ১১ বলে হাফ সেঞ্চুরি, ৩০ বলে ৯০—এসব তো বৈভবই করেছে। তা হলে কেন ওকে দলে নেওয়া হবে না?’
প্রাক্তন স্পিনার-অলরাউন্ডার রবিচন্দ্রন অশ্বিন আবার বৈভবকে তাড়াহুড়ো করে মাঠে না নামিয়ে দলের সঙ্গে কয়েকদিন রেখে জল-তোয়ালে বইয়ে

পরিবেশের সঙ্গে মানানসই করে তোলার পক্ষপাতী। তাঁর মতে, ‘ভারতীয় দলে নিয়মিত খেলতে গেলে মাঠের বাইরের এই অভিজ্ঞতাগুলিও থাকা দরকার।’
বীরেন্দ্র শেহবাগ আবার আর একধাপ এগিয়ে। বরাবরই চাঁছাছোলা ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত প্রাক্তন এই ওপপেনার বলেছেন, “বিহার বা মধ্যপ্রদেশ আসা ক্রিকেটারদের কিছু অসুবিধা থাকেই। তাদের সমর্থন করার মতো কোনও শক্তিশালী লবি থাকে না।

অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক এত খারাপ ব্যাটিং করলেও দলে খেলেই যাবে, কারণ, তারা হয় মুম্বাইয়ের, নয়তো মুম্বাইয়ের হয়ে খেলে। ভাবুন তো, বৈভব আর রজত যদি মুম্বাইয়ের হতো বা মুম্বইয়ের হয়ে খেলত, তাহলে অজিত আগরকর কোনওভাবে ওদের দল থেকে বাদ দিতে পারত?” শেহবাগের এই মন্তব্য বিতর্কে ইন্ধন জুগিয়েছে। ক্রিকেটে প্রাদেশিকতার রোগ সত্যিই যদি ফিরে আসে, তা হলে তা ভারতীয় ক্রিকেটের পক্ষে মোটেই ভাল না।

রবিবার সিরিজ হারের পর কোচ গৌতম গম্ভীর নিজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি। পাঠিয়ে দেন সহকারী কোচ রায়ান টেন দুশখাতে-কে। তিনি গম্ভীরেরই বার্তা বহন করে আনেন এবং বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার জন্য বৈভব পুরোপুরি প্রস্তুত। কিন্তু তাই বলে সঞ্জু স্যামসনকে দল থেকে বাদ দেওয়া যায় না। মাত্র তিন মাস আগে যে ক্রিকেটার ভারতকে বিশ্বকাপ জেতানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, তাকে বাদ দেওয়া কঠিন।’

ভারতীয় দল না কি দলের ক্রিকেটারদের উন্নতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে চায়। সাংবাদিকদের সেটাই জানিয়ে দেন রায়ান। বলেন, ‘আমরা চাই ক্রিকেটারদের দলে পর্যাপ্ত সময় ও ধারাবাহিক সুযোগ দিতে। তাই বৈভব যতই প্রস্তুত থাকুক, আর ওকে খেলতে দেখার জন্য আমরা এবং আপনারা যতই উৎসুক হই না কেন, দলের অন্য সবার মতো ওকেও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ওকে ধৈর্য ধরতে হবে, নিজের সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ও কতটা ভালো ক্রিকেটার এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে আমাদের মনে কোনও প্রশ্নই নেই।’

এ বার সামনে ইংল্যান্ড সফর, যেখানে ভারতকে দুটো নয়, পাঁচটা টি-২০ খেলতে হবে। সেখানে আরও বড় পরীক্ষা, যে পরীক্ষায় আত্মবিশ্বাসও একটা বড় শক্তি। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুই ম্যাচে দলের টপ অর্ডার ব্যাটাররা যা পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, তাতে আত্মবিশ্বাসের দফা রফা হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু কেন বৈভবকে আপাতত বসিয়ে রাখতে চাইছেন গম্ভীর-রায়ানরা? কারণ, ভারতীয় ব্যাটারদের আসল রোগটা কী, তা তাঁরা ধরতে পেরেছেন। কী সেই রোগ?

টি-২০ বিশ্বকাপে ও তার আগে উপমহাদেশের মাঠে তাঁদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বিদেশের মাটিতেও বজায় থাকবে— এই আশা নিয়েই ভারত অভিজ্ঞ তিন ব্যাটার সঞ্জু স্যামসন, অভিষেক শর্মা ও ও ইশান কিষাণকে আয়ারল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হল, যে উইকেটে বল ব্যাটে ভালো আসে, নিয়মিত বাউন্স থাকে কিংবা স্পিনারদের সহায়তা মেলে, সেখানে অভিষেক, সঞ্জু এবং ইশানদের অপ্রতিরোধ্য বলেই মনে হয়। কারণ, এই ধরনের উইকেটে তারা নির্ভয়ে বলের লাইনে গিয়ে বড় শট খেলতে পারে।

কিন্তু আধুনিক আইপিএল ক্রিকেটে প্রচলিত অতি আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ধরন বিদেশের সেইসব উইকেটে হুবহু প্রয়োগ করা যায় না, যেখানে বল বাতাসে সুইং করে এবং পিচে পড়ে গতিপথ পরিবর্তন করে। বেলফাস্টের দুই ম্যাচেই বল বাতাসে সুইং করেছে এবং পিচে বল নড়াচড়াও করেছে যথেষ্ট। সেই কারণেই ভারতের টপ-অর্ডার ব্যাটারদের মধ্যে এই উইকেটের পক্ষে উপযুক্ত রক্ষণাত্মক দক্ষতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবং এর ফলেই আইরিশ বোলাররা বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভারতের আধুনিক ব্যাটারদের মধ্যে ‘আক্রমণই সেরা রক্ষণ’— এই মানসিকতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের কন্ডিশনে সেই কৌশল একেবারেই কার্যকর হয়ে ওঠেনি।বৈভব সূর্যবংশীকে দলের বাইরে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত যে শুধু তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকই পিছিয়ে দিয়েছে, তা নয়, বরং প্রথম এগারোর টপ অর্ডার ব্যাটিংয়ের বাস্তব ছবিটাও স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে। ভারতের প্রথম সারির

ব্যাটাররাই যদি আয়ারল্যান্ডের মতো কন্ডিশনে সুইং ও সিম করা বল সামলাতে ব্যর্থ হন, তা হলে একজন কিশোর প্রতিভা এই চাপ কী ভাবে সামলাবেন, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সমস্যাটা তাই শুধু বৈভবের না খেলা নিয়ে নয়, বরং সমস্যাটা আরও বড়।ভারতীয় ব্যাটাররা এই সমস্যা দূর করতে না পারলে যে ইংল্যান্ডে গিয়ে পুরো দলকেই প্রবল ভুগতে হবে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

ইংল্যান্ডেও প্রায় একই ধরনের পরিবেশ ও উইকেট। সে কথা ভেবেই তৈরি হতে হবে বৈভবকেও। এই ধরনের উইকেটে তাঁর ‘স্ল্যাম ব্যাং’ ব্যাটিং স্টাইল যে মানানসই হবে না, তা বুঝতে পারছেন বলেই কোচেরা তাঁকে এখনই সমুদ্রে সাঁতার কাটতে নামিয়ে দিতে চাইছেন না। তাই ইংল্যান্ডেও যে শুরু থেকেই বৈভবকে ব্যাট হাতে নেমে পড়তে দেখা যাবে, এমন আশা বোধহয় না করাই ভাল।