উজবেকিস্তানকে পাঁচ গোলে হারানোর পর যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন টিভি ক্যামেরা তাঁর সঙ্গে প্রায় ছায়ার মতো তাঁকে অনুসরণ করছিল। ক্যামেরাম্যান নিশ্চয়ই অভিজ্ঞ, জানতেন নিশ্চয়ই এমন কিছু প্রতিক্রিয়া জানাবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, যা সারা বিশ্বে ভাইরাল হয়ে যেতে পারে। এবং হলও ঠিক তাই।
মাঠ ছাড়তে ছাড়তে টিভি ক্যামেরা দেখেই তার দিকে তাকিয়ে রোনাল্ডো চিৎকার করে দু’বার বললেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক, আই অ্যাম ব্যাক’, অর্থাৎ, ‘আমি ফিরে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি’। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হওয়ার আগে থেকেই মঙ্গলবার ম্যাচের আগে পর্যন্ত যত তীর নিক্ষেপ করা হয়েছে তাঁর ও তাঁর দলের দিকে, তার প্রতিটির হিসেব এ দিন বুঝে নেন সিআর সেভেন ও তাঁর সতীর্থরা। এমনকী তাঁকে প্রথম এগারো থেকে বাদ দিতে পারেন কোচ, সেই রটনাও রটেছিল। এ সব কিছুর জবাব যেন দিলেন ওই এক বাক্যে- ‘আই অ্যাম ব্যাক’।
ম্যাচের পরে সাংবাদিক বৈঠকে ‘আই অ্যাম ব্যাক’ মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী রোনাল্ডো বলেন, “যাতে সমালোচকেরা ভুলে না যায়— ২৩ বছর ধরে আমি এভাবেই করে আসছি, সে জন্যই ও ভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছি।’
প্রাক্তন ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি-সহ বিশ্বের বহু ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও ফুটবলপ্রেমীরাও রোনাল্ডোর গায়ে চরম স্বার্থপর খেলোয়াড়ের তকমা এঁটে দিয়েছিলেন। আজ তাদেরও জবাব দেওয়ার পালা তাঁর। বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। তবে দল যে সাফল্য পেয়েছে এবং এই জয় আমাদের যে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যক্তিগত রেকর্ড অবশ্যই সবসময়ই আনন্দের। কিন্তু আমার লক্ষ্য সবসময় দলের উদ্দেশ্য পূরণে সাহায্য করা।’
গত কয়েক দিনে প্রচুর সমালোচনা ও নিন্দা হজম করতে হয়েছে পর্তুগাল শিবিরকে, বিশেষ করে রোনাল্ডোকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের নিয়ে কম হাসি-মস্করা হয়নি। সে সবের জবাব দিতে পেরে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলারদের অন্যতম রোনাল্ডো। বলেন, ‘সারা সপ্তাহজুড়ে আমাদের অনেক বাধার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু দল খুব ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং আমরা অনেক উন্নতি করেছি, এটাই সবচেয়ে ভাল খবর। কঠিন একটা সপ্তাহ পেরিয়ে এসেছি আমরা। বলে কিক না মেরেই যেন অন্ধকারে ঢাকা একটা সপ্তাহ। কিন্তু আমরা সবসময় যেভাবে পরিস্থিতি সামলাই, সেভাবেই সামলেছি। কারণ, আমরা নিজেদের কর্মের ওপর বিশ্বাস রাখি। সময়টা কঠিন ছিল, কিন্তু আমরা ফিরে এসেছি।’
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন রোনাল্ডোদের কোচ রবার্তো মার্তিনেজও। গত এক সপ্তাহে তাঁকে নিয়েও কম নিন্দা-মন্দ হয়নি। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচতারা জয়ের পর কোচ জানিয়ে দেন, কঙ্গোর বিরুদ্ধে হতাশাজনক ড্রয়ের পর দলের মনোবল বাড়াতে এবং পারফরম্যান্সের উন্নতি করতে রোনাল্ডো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
মার্তিনেজ বলেন, ‘খুব কঠিন একটা সপ্তাহ কাটিয়েছি আমরা। কারণ, (প্রথম ম্যাচে) আমরা যে ফলাফল চেয়েছিলাম তা পাইনি। সেই সঙ্গে সমালোচনা ও নানা মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা আসলে অন্যায্য ছিল। আমরা ক্ষুব্ধ ছিলাম, অসুস্থ বোধ করছিলাম, কিন্তু দল হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়েছি। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছি এবং নিজেদের সেরাটা দিতে পেরেছি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো একজন আদর্শ অধিনায়ক। ও পুরোপুরি ফোকাসড্ ছিল এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে। কারণ এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি ও এই প্রথম হয়নি।’
রোনাল্ডোর প্রশংসা করে মার্তিনেজ আরও বলেন, ‘আমাদের অধিনায়ক একজন আইকন। ও এই নিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলছে। ও এমন একজন আদর্শ, যে পর্তুগাল জাতীয় দলের জন্য খেলে, প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে, প্রতিটি অনুশীলনে নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করে এবং মাঠে ও ড্রেসিংরুমে তার অসাধারণ মনোভাবের প্রভাব বিস্তার করে।’
ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনাল্ডোর প্রাক্তন সতীর্থ ওয়েন রুনি বিবিসি স্পোর্টসকে বলেন, ‘এই টুর্নামেন্টে অন্য সব সেরা খেলোয়াড় যখন গোল করছে, তখন ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপে দুটো গোল করা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সে হয়তো তার সেরা ম্যাচ খেলেনি, কিন্তু এটাই সে করে। কিছু সমালোচনার মুখে পড়েছিল, আর এভাবেই সে জবাব দিয়েছে। পুরো কেরিয়ার জুড়েই ক্রিশ্চিয়ানো এটা করে এসেছে।’
রুনি আরও বলেন, ‘ও সবসময়ই সেরা হতে চায় এবং চিরকাল এমনই ছিল। অন্য ফরোয়ার্ড ও আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা যখন গোল করছে, তখন ও চায় সেই তালিকার শীর্ষে থাকতে। আজ তার প্রতিক্রিয়া ঠিক তেমনই, যেমনটা তার কাছ থেকে আশা করা যায়। সেরা হওয়ার ইচ্ছার দিক থেকে ও স্বার্থপর ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে সে টিমম্যানও। আগের রাতে মেসিকে দেখেছি, আর আজ রোনাল্ডোকে। এই বয়সে তারা যা করছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’ গ্রুপ কে-র শীর্ষস্থান নির্ধারণ এবং নকআউট পর্বে কারা যাবে, তা ঠিক করতে পর্তুগাল তাদের শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার মুখোমুখি হবে ভারতীয় সময়ে ২৮ জুন ভোর পাঁচটায়।