মাকে না জানিয়েই জাপানে পাড়ি! এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ জিতে মাকে চমকে দিলেন সীমা

Seema Bronze Winner Photo-SNS

মায়ের দুশ্চিন্তা হবে। তাই জাপানে এশিয়ান গেমসে যাচ্ছেন—সেটাই তাঁকে জানাননি সীমা। মা ভেবেছিলেন, মেয়ে হয়তো বেঙ্গালুরুতে রয়েছেন। আর সেই সময়ই জাপানের নাগোয়ায় ১০ হাজার মিটারের ট্র্যাকে দৌড়ে ভারতের হয়ে ব্রোঞ্জ জিতে ইতিহাস গড়লেন হিমাচল প্রদেশের ২৫ বছরের অ্যাথলিট।

বৃহস্পতিবার মহিলাদের ১০,০০০ মিটার দৌড়ে ৩২ মিনিট ৫০.০৫ সেকেন্ড সময় করে তৃতীয় হন সীমা। এই ইভেন্টে ২০১০ সালের পর ফের এশিয়ান গেমসে পদক পেলেন কোনও ভারতীয়।

মাকে কেন জানাননি?


সীমার বাবা মারা গিয়েছেন বহু বছর আগে। হিমাচলের চম্বা জেলার রেতা গ্রামের পরিবারের সবচেয়ে ছোট মেয়ে সে। ৭৮ বছরের মায়ের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। মেয়েকে নিয়ে এমনিতেই তাঁর উদ্বেগ বেশি। তাই বড় প্রতিযোগিতায় যাওয়ার কথা মাকে জানাননি সীমা।

পদক জয়ের পরে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা নেই। আমার মায়ের অনেক বয়স, প্রায় ৭৮ বছর। আমি যখনই বাইরে যাই, মা খুব চিন্তা করেন। তাই তাঁকে বলিনি যে আমি এশিয়ান গেমসে নামতে জাপানে যাচ্ছি’।

সীমা আরও বলেন, ‘আমি কোথায় ট্রেনিংয়ে যাচ্ছি বা কোথায় খেলতে যাচ্ছি, মাকে সব সময় বলি না। শুধু আমার দিদিকে জানাই। মা জানতে পারলে এক দিন ঘুমোতে পারবেন না। তাঁর উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে’।

এখন অবশ্য টিভিতে মেয়েকে দেখে সবটাই জেনে যাওয়ার কথা মায়ের। সীমার কথায়, ‘আমার মনে হয় দিদির কাছ থেকে মা এতক্ষণে জেনে গিয়েছেন। হয়তো টেলিভিশনেও আমাকে দেখেছেন। না হলে তিনি এখনও ভাবছেন আমি বেঙ্গালুরুতে আছি’।

 

ছোটবেলা থেকেই দৌড়ের নেশা

চাম্বার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা থেকে উঠে এসেছেন সীমা। মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবাকে হারান। ছোটবেলায় খালি পায়ে দৌড়েছেন, গরু চরিয়েছেন। পরিকাঠামোর অভাব থাকলেও অ্যাথলেটিক্সের প্রতি তাঁর টান কমেনি। মা-ও পাশে ছিলেন।

এ বার সেই মেয়েই এশিয়ান গেমসের মঞ্চে পদক জিতলেন। ১০ হাজার মিটারে এটি ভারতের তৃতীয় পদক। ২০১০-এ প্রিজা শ্রীধরন সোনা এবং কবিতা রাউত রুপো জিতেছিলেন।

চেয়েছিলেন সোনা

এদিন সীমার দৌড় ছিল অত্যন্ত কৌশলী। শুরুতে গতি খুব বেশি ছিল না। সীমাও বুঝে গিয়েছিলেন যে শেষ দিকে লড়াই জমবে। শেষ পর্যন্ত সোনা জিততে না পারলেও পদক নিশ্চিত করেন তিনি।

সীমা বলেন, ‘এটা আমার প্রথম এশিয়ান গেমস। ব্রোঞ্জ জিততে পেরে আমি গর্বিত। আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে’।

দৌড় নিয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘রেসটা খুব কৌশলনির্ভর ছিল। সবাই পদকের জন্য দৌড়চ্ছিল। আমিও ভেবেছিলাম পদকের জন্য লড়ব, কারণ এটা আমার প্রথম এশিয়ান গেমস। সবাই দেশের জন্য সোনা জিততে চায়। আমিও সোনা জেতার জন্য লড়েছিলাম, কিন্তু ব্রোঞ্জ পেয়েছি। তাতেও আমি খুশি।’

তবে এখানেই থামতে চান না সীমা। সোমবার তাঁর ৫,০০০ মিটারের ইভেন্ট। ‘আমি খুব চেষ্টা করব, যাতে পদকের রং বদলাতে পারি,’বলেছেন তিনি।

তিন বছর আমেরিকায় প্রস্তুতি

সীমার সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি। কোচ স্কট সিমন্সের অধীনে আমেরিকার কলোরাডো স্প্রিংসে অনুশীলন করেছেন তিনি। সেখানে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

সীমা বলেন, ‘আমরা অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে অনুশীলন করি। সেটা আমাদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মানসিক দিক থেকেও সাহায্য করেছে। আমাদের মানসিকতা একই—সেরাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারব।’

আর নাগোয়ায় মেয়ের এই কীর্তির খবর পাওয়ার পর সীমার পরিবারও উচ্ছ্বসিত। তাঁর মা বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের খেলাধুলার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল এবং সে নিজের লক্ষ্যে স্থির ছিল। ‘ওর বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, আনন্দটা আরও অনেক বেশি হত,’ চোখে জল নিয়ে বলেন সীমার মা।

মেয়ে ফিরলে কি না বলে জাপান যাওয়ার জন্য খুব বকবেন, না ব্রোঞ্জ জয়ের আনন্দে এবারের মত ছেড়ে দেবেন?