ব্রাজিলের শেষ বিশ্বকাপ জয়ে তিনিই ছিলেন দলনেতা। ২০০২-এ সেই বিশ্বজয়ের পর থেকে ২৪ বছর হয়ে গেল এখন পর্যন্ত আর কোনো বিশ্বকাপ জেতেনি তারা। এ কথা ভাবলে নিজেই অবাক হয়ে যান সেই দলের অধিনায়ক মার্কোস এভাঞ্জেলিস্তা দ্য মোরেইস।
নামটা শুনে অচেনা লাগতে পারে। তবে সারা দুনিয়া তাঁকে যে নামে চেনে, সেই নামটা শুনলে বুঝতে পারবেন তিনি কে। সারা দুনিয়ায় তিনি ‘কাফু’ নামে বিখ্যাত। বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুলব্যাকদের তালিকায় এই নামটা চিরকাল ওপরের দিকেই থাকবে। সোমবার সেই কাফু ঘুরে গেলেন কলকাতায়। এই শহরের ফুটবলপ্রেমীদের শুনিয়ে গেলেন তাঁর মনের নানা কথা।
রবিবার দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে নানা অনুষ্ঠান ছিল কাফুর। সেসব সেরে সোমবার তিনি আসেন কলকাতায়। ফুটবলের মক্কায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানান স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নবান্নে তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসেন ব্রাজিলীয় ফুটবলের শেষ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।
পরে বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BNCCI) অভ্যর্থনা জানায় কাফুকে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দ্বিভাষিক কথোপকথন হয় বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে প্রিয় ব্রাজিলীয় ফুটবলার হোসে রামিরেজ ব্যারেটোর সঙ্গে। পর্তুগিজে কথা হচ্ছিল দুজনের। কাফু যা বলেন, তার বেশিরভাগটাই ইংরাজিতে তরজমা করে দেন ব্যারেটো।
মাতৃভাষায় কথা বলা কোনো মানুষকে কাছে পেয়ে মনের এমন অনেক অজানা কথা বলেন ব্রাজিলীয় ফুটবল কিংবদন্তি, যা তাঁর মুখে কখনো শোনা যায়নি হয়তো। কাফুকে ব্যারেটোর প্রশ্ন ছিল, ফুটবল জীবনে কার সঙ্গে খেলতে পারোনি বলে এখন খুব আফসোস হয়?
বেশি না ভেবেই কাফু জবাব দেন, ‘মারাদোনা’, যা শুনে উপস্থিত দর্শকরাও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। কারণ, মারাদোনাও তো কলকাতার অতি প্রিয়। মারাদোনার সঙ্গে খেলতে পারেননি বলে আফসোস করছেন শুনলে দেশের মানুষ আবার হতাশ হতে পারে। ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার রেষারেষি তো বরাবরই। তাই প্রথম উত্তরটা দেওয়ার পরেই আরো একটা উত্তর এল কাফুর কাছ থেকে। বললেন, ‘পেলের সঙ্গেও তো খেলতে পারিনি’। এটা যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য, তা বোঝাই গেল।
২০০২ বিশ্বকাপে যেমন খেলেছেন রোনাল্ডোর সঙ্গে (ক্রিশ্চিয়ানো নন), তেমনই তার আগে খেলেছেন রোমারিওর সঙ্গেও। এই দুই কিংবদন্তির সঙ্গে খেলে কাকে বেশি ভয়ঙ্কর লেগেছিল তাঁর, এই প্রশ্নও করা হয় তাঁকে। কাফু এ বারও বেশি ভাবেননি। সোজা উত্তর দেন, ‘অবশ্যই রোনাল্ডো। ওর মতো বিপজ্জনক স্ট্রাইকার তখন সারা বিশ্বে ছিল না’।
২০০২-এর বিশ্বকাপ জয়ই যে তাঁর ফুটবল জীবনের সেরা মুহূর্ত, তাও জানাতে ভুললেন না। বলেন, ‘ওই মুহূর্তটাই ছিল সবচেয়ে স্মরণীয়। কারণ, সেই সাফল্যের পিছনে ছিল কঠিন পরিশ্রম এবং স্বপ্ন। এক জন পেশাদার ফুটবলারের জীবনে চ্যালেঞ্জ সব সময়ই থাকে। ত্যাগ ছাড়া কোনও জয়, কোনও ট্রফি পাওয়া যায় না। আমরা সাধারণ পরিবার এবং সাধারণ পরিবেশ থেকে উঠে এসেছি, কিন্তু আমাদের স্বপ্ন ছিল বিশাল। সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছিল সে দিন। তাই সেই দিনটার কথা জীবনেও ভুলতে পারব না”।
ভারতে এসে যে তিনি দারুন খুশি, তাও জানাতে ভুললেন না কাফু। বললেন, ‘ভারতের ফুটবলপ্রেমীরা ব্রাজিলকে কত সমর্থন করে, আমি তা শুনেছি। সারা বিশ্বে ব্রাজিলকে আর কোনও দেশ এত সাপোর্ট করে বলে মনে হয় না। সেই দেশে আসতে পারা আমার কাছে পরম সৌভাগ্যের। ভারতীয়দের ধন্যবাদ জানাতেই আমি এসেছিল। শুনেছি কয়েকদিন পরে আমাদের জাতীয় দলও আসবে এই শহরে। সত্যিই তা হবে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত’।
ভারতকে নিয়ে কাফুর সবচেয়ে জোরালো বার্তা, ‘ফুটবলে নিজেদের এত ছোট ভাববেন না। আপনারা জায়ান্ট। আপনাদের বিশ্বাস করতে হবে যে, আপনাদের বড় কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবে পরিণত করার জন্য দরকার পরিকল্পনা’। তিনি আরো বলেন, ‘একটা শিশুকে সুযোগ দিতে হবে। চিন এবং জাপান যেমন করেছে, ভারতও সেটা করতে পারে। ভাল কোচ আনতে হবে, বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে হবে এবং সেই জ্ঞান ভারতীয় শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে”।
তবে শিশুদের ফুটবল প্রশিক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে যে প্রয়োজন পড়াশোনাও, তা জানাতে ভুললেন না কাফু। বলেন, ‘শিক্ষা খুব জরুরি। ফুটবলারদের শিক্ষিত হওয়াটা খুব দরকার। শিক্ষার অভাব থাকলে তাদের মানসিকতাতেও ঘাটতি দেখা যায়। সেই জন্য শিশুদের ফুটবল শেখানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের পড়াশোনাও করাতে হবে সমান ভাবে। তাহলেই খেলোয়াড় হিসেবে তাদের সঠিক বিকাশ ঘটবে’।