রণজিৎ দাস
শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯১১-এর আইএফএ শিল্ড জয় দিয়ে, কিন্তু ষাটের দশকের ময়দান ছিল প্রকৃত অর্থে রূপকথার এক সাম্রাজ্য। সেই সময়ে গ্যালারি ঠাসা হাজার হাজার মানুষ আসতেন ফুটবলের শুদ্ধ শিল্প দেখতে। মোহনবাগানের জার্সিতে তখন শাসন করছেন চুনী গোস্বামী—যার ড্রিবলিং আর ক্ষিপ্রতা ছিল রাজকীয়। অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গলের ‘পঞ্চপান্ডব’ আমেদ খান, আপ্পারাও, ধনরাজ, সালে আর ভেঙ্কটেশ- যে স্বর্ণযুগ তৈরি করেছিলেন, তার রেশ ছিল পরবর্তীকালেও। পি.কে. ব্যানার্জি এবং পরিমল দে,বলরামের মতো শিল্পীরা যখন মাঠে নামতেন, তখন ফুটবল স্রেফ খেলা নয়, কবিতা হয়ে উঠত। তখন মানুষ মাঠে যেতেন কেবল গোল দেখতে নয়, চুনী গোস্বামীর একটা বডি ডিসেপশন কিংবা বলরামের সেই অবিশ্বাস্য রিসিভিং চাক্ষুষ করতে।
সত্তরের দশকে এই উন্মাদনা এক অন্য শিখরে পৌঁছায়। মাঠ শাসন করতেন প্রশান্ত সিনহা, রাম বাহাদুর, পিটার থঙ্গরাজ, শান্ত মিত্র এবং সুধীর কর্মকারের মতো দুর্ভেদ্য ডিফেন্ডার কিংবা তরুণ বসুর মতো অতন্দ্র প্রহরী গোলকিপার। মাঝমাঠের দখল নিয়ে তখন মোহনবাগানের গৌতম সরকার বনাম সমরেশ চৌধুরির ইস্টবেঙ্গলের লড়াই ছিল দেখার মতো। গৌতমের সেই পেলের বিপক্ষে খেলা কিংবা প্রসূন ব্যানার্জি ও প্রশান্ত ব্যানার্জির বল ডিস্ট্রিবিউশন আজও প্রবীণ দর্শকদের চোখে ভাসে। অন্যদিকে রক্ষণে সুব্রত ভট্টাচার্য (বাবলু) আর মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের (মনা) লড়াই ছিল চিরকালীন ডার্বির মশলা। আটের দশকে এসে এই উন্মাদনা পায় নতুন মাত্রা,বিকাশ পাঁজি আর ‘ভারতীয় ফুটবলের ম্যারাডোনা’ খ্যাত কৃশানু দের জাদুকরী পায়ে। কৃশানুর থ্রু পাস আর বিকাশ পাঁজির উইং দিয়ে দৌড় দেখার জন্য তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ রোদে-বৃষ্টিতে লাইনে দাঁড়াতেন। মানস ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু, সাবির আলি, শ্যাম থাপা, সুভাষ ভৌমিকদের খেলা দেখার জন্য ভোরের সূর্য ওঠার আগেই সমর্থকরা মাঠে লাইন দিতে ছুটে আসতেন। তার পরেও ভুলে থাকা যাবে না মহম্মদ হাবিব ও মহম্মদ আকবরের সেই দুরন্ত খেলা। কৃশানুর এক একটা পাসে যেন প্রাণ পেত মৃতপ্রায় আক্রমণভাগ, আর গ্যালারিতে উঠত সেই পরিচিত গগনভেদী চিৎকার।
কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে এখন সময়ের বিবর্তন আমাদের এক বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ময়দান কাঁপানো সেই ‘বিদেশি জাদুকর’ আজ কোথায়? মজিদ বাসকারের সেই মায়াবী ড্রিবলিং যা দেখে দর্শকরা পাগল হয়ে যেত, কিংবা চিমা ওকারির সেই বুলেট গতির শট এবং পাওয়ার ফুটবল—যা প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিত। মোহনবাগানের ঘরের ছেলে হয়ে ওঠা হোসে রামিরেজ ব্যারেটোর এক একটা গোল বা কর্নার থেকে হেড, যেমন গ্যালারিকে উৎসবে মাতাত,।তেমন আকর্ষণ আজ আই-লিগ বা আইএসএল-এর যুগেও কি আমরা খুঁজে পাই? ব্যারেটো যখন মাঠে নামতেন, তখন সবুজ-মেরুন গ্যালারি জানত—কিছু একটা মিরাকল হবেই। সেই ভরসার জায়গাটাই ছিল ‘ক্রাউড পুলার’-এর আসল সার্থকতা।
বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। আইএসএল-এর হাত ধরে পরিকাঠামো বেড়েছে, অনেক নামী-দামী বিদেশি ফুটবলার ঝাঁকে ঝাঁকে আসছেন। দিমিত্রি পেত্রাতোস, জেসন কামিংস কিংবা সাউল ক্রেসপোরা আধুনিক ফুটবলের বিচারে অনেক বেশি ফিট এবং ট্যাকটিকাল। হয়তো এবার আইএসএলে মোহনবাগান এসজি বা ইস্টবেঙ্গল এফসি চ্যাম্পিয়ন হতে চলেছে— ট্রফি আসবে, গগনভেদী উল্লাস হবে, সল্টলেক স্টেডিয়ামে আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু সেই ৬০ থেকে ৮০-র দশকের সেই ফুটবলাররা, যারা কেবল নিজেদের খেলোয়াড়ী কৌশলে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীকে চুম্বকের মতো মাঠে টেনে আনতেন, তারা আজ যেন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছেন।আজকের দিনে সমর্থকরা মাঠে ছোটেন মূলত ক্লাবের টানে, জার্সির রঙের প্রতি আনুগত্যের টানে কিংবা বড় দলের জেতার আবেগে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো এক জন ফুটবলারের জাদুকরী পায়ের কাজ দেখার জন্য যে দীর্ঘ অপেক্ষা, যে রোমাঞ্চ— তা আজ বড় অনুপস্থিত।
আজ ফুটবল অনেক বেশি কর্পোরেট, অনেক বেশি কোচ-নির্ভর এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। ফলে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত কারিকুরি দেখানোর সুযোগ কমেছে, তারা আজ নির্দিষ্ট কৌশলের দাবার খুঁটি মাত্র। কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছে সেই ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আর একাই ম্যাচ জেতানো ‘কাল্ট হিরো’ ব্যক্তিত্বরা। ময়দান আজ দর্শক পায় ঠিকই, কিন্তু সেই ‘মজিদ-চিমা-ব্যারেটো’ বা ‘কৃশানু-চুনীর জাদুর জন্য গ্যালারি আজও হাহাকার করে। ট্রফি হয়তো আলমারিতে উঠবে, কিন্তু সেই চিরকালীন শৈল্পিক ফুটবলের স্মৃতি রোমন্থন করেই মাঠের টান অনুভব করতে হয় আজকের রোমান্টিক ফুটবলপ্রেমীদের।