বৃহস্পতিবার দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ৩০ বলে সেঞ্চুরি করে তিনি ভেঙে দেন রোহিত (Rohit Sharma) শর্মার রেকর্ড। শেষ পর্যন্ত ৩৪ বলে ১০৮ রান করে আউট হন অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) । তাঁর বিধ্বংসী ব্যাটিংয়েই আফগানিস্তানকে ১২৭ রানে হারিয়ে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জেতে ভারত।
এই বিস্ফোরক ইনিংসের ঠিক আগে অভিষেকের (Abhishek Sharma) কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এক বিশেষ বার্তা। পাঠিয়েছিলেন তাঁর মেন্টর যুবরাজ সিং (Yuvraj Singh)। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টির পর অভিষেককে (Abhishek Sharma) যুবরাজ (Yuvraj Singh)বুঝিয়েছিলেন, সব বলকে জোর করে মারার দরকার নেই। পরিস্থিতি বুঝে মাঝে মাঝে সিঙ্গল নেওয়াও জরুরি।
অভিষেক (Abhishek Sharma) নিজেই জানালেন সে কথা। বলেন, ‘শেষ ম্যাচের পর ওঁর কাছ থেকে শুধু একটা মেসেজ পেয়েছিলাম—সব বল জোর করে মারার চেষ্টা করিস না। বিশেষ করে এই পরিস্থিতিতে, মাঝে এক-দু’টো সিঙ্গল নিয়ে নিলেও হয়। যে বল আমার জায়গায় নেই, সেই বলেও আমি সিঙ্গল নিতে পারি।’
তবে যুবরাজের (Yuvraj Singh) পরামর্শের আরও একটি দিক ছিল। অভিষেককে (Abhishek Sharma) আরও লম্বা সময় ক্রিজে থাকার কথা বলেছিলেন ভারতের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন প্রাক্তন অলরাউন্ডার। অভিষেকের কথায়, ‘স্যর সব সময়ই চান আমি অনেকক্ষণ ব্যাট করি। আমার মাথাতেও সব সময় থাকে যে, দলকে যদি এমন স্টার্ট দিতে পারি, আর শেষ পর্যন্ত আমরা জিতি, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
আরও পড়ুন: ৩০ বলে শতরান! আফগানদের উড়িয়ে দ্রুততম টি টোয়েন্টি সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড অভিষেকের
আফগানিস্তান সিরিজের আগে অবশ্য খুব স্বস্তিতে ছিলেন না অভিষেক (Abhishek Sharma)। টানা সাতটি টি-টোয়েন্টি ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসেনি কোনও অর্ধশতরান। তার মধ্যে চারটি ইনিংসে তিনি এক অঙ্কের রানেই আউট হয়েছিলেন। পাশাপাশি ওপেনিংয়ের জায়গা নিয়ে তাঁকে লড়তে হচ্ছিল সঞ্জু স্যামসন এবং মাত্র ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশীর সঙ্গে। তখন তাঁকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল।
কিন্তু আফগানিস্তান সিরিজ শুরু হতেই বদলে যায় ছবিটা। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ৩২ বলে ৮২, দ্বিতীয় ম্যাচে ৩৯। আর তৃতীয় ম্যাচে যেন সব হিসাব চুকিয়ে দিলেন অভিষেক। ৩০ বলে শতরান করে রোহিতের ৩৫ বলে শতরানের ভারতীয় রেকর্ড ভাঙলেন। ৩৪ বলে তাঁর ১০৮ রানের ইনিংসে ছিল ৯টি চার এবং ১১টি ছক্কা।
এই বিস্ফোরক ইনিংসের পরে সব সমালোচনার জবাব দিলেন ভারতীয় ওপেনার। তাঁর বার্তা, দু-একটা খারাপ সিরিজ দিয়ে একটা দলের ব্যাটিং শক্তিকে বিচার করা যায় না।
অভিষেক (Abhishek Sharma) বললেন, ‘প্রথম সাক্ষাৎকারেই আমি বলেছিলাম, গত দু’বছর ধরে আমরা এ ভাবেই খেলে আসছি। এক-দু’টো খারাপ সিরিজ আমাদের ব্যাটিং বিভাগের পরিচয় ঠিক করে দেবে না। বিশ্বকাপের আগে পুরো বছর, প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কেন, আমরা আধিপত্য দেখিয়েছি’।
এখানেই থামেননি তিনি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ওঠানামা থাকবেই বলে মনে করেন অভিষেক। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত ব্যর্থতার সময়েও দলের প্রত্যেকের পাশে থাকা জরুরি।
‘এক জন ব্যাটার হিসাবে কখনও ভাল সময় আসবে, কখনও খারাপ সময়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, দল হিসাবে আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে এবং একে অপরকে সমর্থন করতে হবে। এই ভাবেই এমন ইনিংস আসে,’ বলেছেন অভিষেক।
শুধু দ্রুততম ভারতীয় শতরানই নয়, টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দু’বার ৪০ বলের কমে শতরান করা প্রথম ব্যাটারও হলেন অভিষেক। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২০২৫-এ ৩৭ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। দিল্লিতে এল আরও দ্রুত শতরান।
তিন ম্যাচে অভিষেকের মোট রান ২২৯। সিরিজের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও তিনিই। যুবরাজের সেই ছোট্ট বার্তার অর্থ যেন আরও স্পষ্ট—আক্রমণাত্মক ব্যাটিং অভিষেকের স্বভাব, কিন্তু প্রতিটি বলেই ছক্কা মারতে হবে এমন নয়। কখনও কখনও একটি সিঙ্গলও বড় ইনিংসের রাস্তা খুলে দিতে পারে।
আরও পড়ুন: আম্মানে জোড়া গোলে এগিয়ে থেকেও ড্র কেন লাল-হলুদের? কী বললেন দানি রামিরেজ?
কিন্তু এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পিছনেও থাকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা। প্রতিটি সিরিজের আগে প্রতিপক্ষের বোলারদের নিয়ে আলাদা করে ভাবেন তিনি। অভিষেকের কথায়, ‘প্রতিটি সিরিজের আগে আমার প্রক্রিয়াটা খুব নির্দিষ্ট থাকে। আমি কার বিরুদ্ধে খেলছি, তাদের কোন বোলাররা রয়েছে—সব দেখি। পাওয়ার প্লে-তে কী ভাবে খেলব, সপ্তম বা অষ্টম ওভারে কে বল করবে, সেটাও ভাবি।’
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অধিনায়ক ও কোচের সমর্থনকেও বড় করে দেখছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমি যে ভাবে খেলি, সেখানে অধিনায়ক এবং কোচের আমার পাশে থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাছ থেকে একটা নিশ্চয়তা দরকার হয়। এই ইনিংসের পিছনেও তাঁদের অবদান রয়েছে।’
অভিষেকের ব্যাটিংয়ের মূল মন্ত্র অবশ্য খুবই সহজ—নিজেকে আটকাবেন না। তাঁর কথায়, ‘আমি কোনও এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে চাই না। শুধু বল দেখব এবং সেই অনুযায়ী খেলব। প্রথম দিন থেকেই ব্যাপারটা খুব সহজ—বল দেখো, বল মারো। সব সময় ভাল খেলতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আমাদের দলে যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা হল আধিপত্য দেখানো। এখনও পর্যন্ত সেটা ভালই কাজ করছে।’
আর দিল্লিতে সেই মন্ত্র মেনেই অভিষেক (Abhishek Sharma) দেখিয়ে দিলেন, বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ইনিংস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও ধীরে ধীরে তাঁর খেলায় উন্নত হচ্ছে।
দেখুন: কাঁচরাপাড়ায় মমতার সফরে বিক্ষোভ, গাড়ি ঘিরে ‘চোর-চোর’ স্লোগান, ছোড়া হল চটি-কাদা