ইংল্যান্ড শিবিরে এখন একজনই মহানায়ক, দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেওয়ার পর কী বললেন হ্যারি কেন?

বুধবার আটলান্টা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড বনাম কঙ্গো ম্যাচ ৭৫ মিনিট পর্যন্ত যে অবস্থায় ছিল, কঙ্গোর ডিফেন্ডাররা যদি আর ১৫ মিনিট সেই অবস্থা ধরে রাখতে পারতেন, তা হলে ফুটবল ইতিহাসে এক নয়া অধ্যায় লিখতেন তাঁরা। কিন্তু পারলেন না এক জনের জন্যই, তিনি ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ও সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হ্যারি কেন।

ম্যাচের পর ইংল্যান্ড শিবিরে তাই একজনই নায়ক। সারা ইংল্যান্ড জুড়েই হইচই চলছে তাঁকে নিয়ে। তিনি ‘হ্যারি দ্য গ্রেট’। এই বিশ্বকাপে কেনের গোলসংখ্যা এখন পাঁচ। ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াই এখন চার তারকার দৌড়ে পরিণত হয়েছে—হ্যারি কেন, কিলিয়ান এমবাপে, এর্লিং হালান্ড এবং লিওনেল মেসি। ম্যাচের পর সাংবাদিক বৈঠকে এসে এ প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ থমাস টুখেল বলেন, “ওরা সবাই হাঙর। রক্তের গন্ধ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই বিশ্বকাপের বড় তারকারা বোধহয় একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি গোল করলে? তা হলে আমিও করব। আমি হ্যাটট্রিক করব, তারপর দেখা যাবে তুমি কী করো।’ আসলে কী হচ্ছে? রীতিমতো পাগলামি!”

এর পর আসেন নিজের দলের নায়কের কথায়, যিনি বুধবার কোচের সন্মান, চাকরি সবই বাঁচিয়ে দিয়েছেন। টুখেল বলেন, “হ্যারি ভীষণ, ভীষণ ভালো। ও আমাদের অধিনায়ক। আমাদের নেতা। অবিশ্বাস্য ফিনিশিংয়ে সে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়, আর আজও দু’বার সেটাই করেছে। দ্বিতীয় গোলটি ছিল একেবারে অসাধারণ।”


এই জোড়া গোলের সুবাদে কেন এখন বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় ১৩ গোল নিয়ে পেলে-কে ছাড়িয়ে যৌথভাবে ছ’নম্বরে উঠে এলেন। ইংল্যান্ডের হয়ে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ৮৪, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় কিংবদন্তি হাঙ্গেরিয়ান ফেরেঙ্ক পুসকাসের সঙ্গে যৌথভাবে নবম স্থানে পৌঁছে দিয়েছে। ইংল্যান্ডের হয়ে এই পর্যায়ে তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু গ্যারি লিনেকার, যার ঝুলিতে রয়েছে ছটি গোল।

বয়স ৩২ হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন আরও উন্নত হচ্ছেন কেন। শুধু গোল করার দক্ষতাতেই নয়, তাঁর পাস দেওয়ার বৈচিত্র্য এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও আরও পরিণত হয়েছে। ইংল্যান্ড দলে তাঁর সতীর্থ জুড বেলিংহাম বলেছেন, “ভবিষ্যতে আমি হ্যারি কেনকে এমন একজন ফুটবলার এবং মানুষ হিসেবে মনে রাখব, যার সঙ্গে একই দলে খেলতে পেরে আমি গর্বিত ও সৌভাগ্যবান”।

অ্যান্থনি গর্ডনও কেনকে নিয়ে একই রকম উচ্ছ্বসিত। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার বলেন, “ভালো গোল যে কেউ করতে পারে। এই পর্যায়ের যে কোনো ফুটবলারই বলটাকে জালের ওপরের কোণে পাঠাতে পারে। কিন্তু পার্থক্যটা হলো, হ্যারি যেভাবে ধারাবাহিকভাবে সেটা করে। প্রতিদিন অনুশীলনে। প্রতিটি ম্যাচে। এটা অবিশ্বাস্য। ও সবসময়ই অসাধারণ উচ্চমানের ফুটবল খেলে।”

বুধবার কঙ্গোর বিপক্ষে মোটেই সময় নষ্ট করেননি হ্যারি কেন। অবশ্য তাঁর হাতে সে সুযোগও ছিল না। সারা ম্যাচ জুড়ে ইংল্যান্ডকে ঘিরে যখন একের পর এক আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তখনই হ্যারি কেন যেন একাই সিদ্ধান্ত নিলেন, ইংল্যান্ডকে তিনি ডুবতে দেবেন না।
এই মহানায়কোচিত পারফরম্যান্সের পর কেন নিজে কী বললেন? “সত্যি বলতে, অনুভূতিটা দারুণ। কী অবিশ্বাস্য একটা ম্যাচ! ওরা খুব কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল। তবে প্রথম বিরতির পর আমরা অনেক ভালো খেলেছি, আর ওদের গোলরক্ষক অবিশ্বাস্য কিছু সেভ করেছে। আমরা বলছিলাম, এই ধরনের ম্যাচে কেউ না কেউ নায়ক হয়ে ওঠে। সেটা যে কেউ হতে পারে। আজ সেই মানুষটা আমি ছিলাম”।

তিনি আরো বলেন, “সারা সপ্তাহ আমরা শুধু নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলার কথা বলেছি। অবশ্যই এখনও অনেক কিছু উন্নতির জায়গা আছে। তবে এই নকআউট পর্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যেভাবেই হোক জিতে পরের রাউন্ডে ওঠা। এখন আমরা টুর্নামেন্টের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনতেই হয়। আর আজ আমরা ঠিক সেটাই করতে পেরেছি।”

শৈশবের স্মৃতি টেনে এনে কেন বলেন, “ছোটবেলায় ইংল্যান্ডের খেলা দেখার কথা আমার এখনও মনে আছে। বিশ্বকাপ দেখতাম আর স্বপ্ন দেখতাম, একদিন আমিও এই মঞ্চে খেলব। মাঠে নামার সময় আমি সেই অনুভূতিটা কখনো ভুলে যেতে চাই না। আমি সবসময় নিজের সেরা সংস্করণ হওয়ার চেষ্টা করি। আমি জানি, বিশ্বের লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে এই বিশ্বকাপ দেখছে। নিজের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেওয়া আমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি, আর এটাই আমার জীবনের অন্যতম মূলমন্ত্র। যখনই আমি মাঠে নামি, দেশের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ারই চেষ্টা করি।” বুধবার কঙ্গোর বিরুদ্ধে ম্যাচেও সেটাই করে দেখালেন তিনি।