বিশ্বকাপে প্রথম গোল করার পর উচ্ছ্বাস, আবেগে ভেসে গিয়ে কী বললেন লামিনে ইয়ামাল?

আটলান্টায় ম্যাচ শুরুর তখনও ৪৩ মিনিট বাকি। ঠিক সেই সময়ই স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে প্রথম গর্জন শোনা গেল। কারণ, জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখা গেল লামিনে ইয়ামালকে। তখনও তিনি হাসিমুখে বসে ছিলেন, বুঝতেই পারেননি যে সবার নজর তাঁর দিকে। হঠাৎ করেই কান ফাটানো গর্জন কানে আসতেই তিনি আটলান্টা স্টেডিয়ামের বিশাল ৩৬০-ডিগ্রি স্ক্রিনে নিজেকে দেখতে পান। মুখে তখনও চুইংগাম, আর সেই চিরপরিচিত হাসি নিয়েই তিনি দর্শকদের দিকে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান।

এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বিশ্বকাপে তাঁর প্রথম গোল করে উচ্ছ্বাসে, আবেগে ভাসতে দেখা যায় ইয়ামালকে। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর কেরিয়ারের প্রথম গোল। টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নেমেই এই মাইলফলক স্পর্শ করলেন স্পেনের ‘বিস্ময়বালক’। তবে মাঝের এই অল্প সময়টুকুতেই লামিনে ইয়ামালের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঠে তাঁর উপস্থিতিই যেন দুই দলের মানসিকতায় পরিবর্তন এনে দেয়। তিনি যেমন স্পেন শিবির ও তাদের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তেকে আনন্দ দেন, তেমনই ‘লা রোহা’র ১৯ নম্বর জার্সিধারীকে ঠেকাতে সৌদি আরবের ডিফেন্ডারদের বাড়তি মনোযোগ দিতে বাধ্য করেন।

বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো প্রথম এগারোয় সুযোগ পেয়ে গোল করতে ইয়ামালের সময় লাগে মাত্র ৫৯৮ সেকেন্ড। আরও বিস্ময়কর বিষয় হল, গোল করার আগে পুরো টুর্নামেন্টে তিনি খেলেছিলেন মাত্র ৩৫ মিনিট—কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ২৫ মিনিট এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট মিলিয়ে তাই তো দাঁড়ায়। অর্থাৎ, বিশ্বকাপে তাঁর প্রথম ম্যাচেই স্পেনের এই নয়া তারকা দ্রুত প্রমাণ করে দেন, কেন তাঁকে বর্তমান ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিভাদের অন্যতম হিসেবে দেখা হয়। ম্যাচের পর ইয়ামাল সাংবাদিকদের বলেন, “এটা খুবই বিশেষ এক অনুভূতি। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন আমি সব সময় দেখেছি, আর এই প্রথম শুরু থেকে নেমেই গোল করতে পারা আমার আমার কাছে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। গত বিশ্বকাপ আমি স্কুলে বসে দেখেছিলাম।” স্পেনের এই তরুণ তারকা ফুটবলার ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল করা কনিষ্ঠ খেলোয়াড়দের তালিকায় আট নম্বরে জায়গা করে নেন।


তবে দ্বিতীয়ার্ধে আর ইয়ামালকে মাঠে রাখেননি। বিরতির সময়েই তাঁকে তুলে নেন স্পেনের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে। যা নিয়ে তিনি ম্যাচের পর বলেন, “ম্যাচে আমরা বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলাম, তাই ইয়ামালকে বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ও আরও কিছু মিনিট খেলতে পারত, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল পরের ম্যাচে ওকে আবার নামতে হবে। তাই নিজেকে পুরোপুরি ফিট এবং তরতাজা অনুভব করাটা খুব জরুরি। আমাদের খেলোয়াড়রা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এবং নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী খেলছে—এটা দেখে আমি খুবই খুশি।”

সতীর্থরাও যে ইয়ামালের খেলায় বেশ খুশি, তা মিডফিল্ডার অ্যালেক্স বেনার কথাতেই স্পষ্ট। ইয়ামালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “লামিনের মাঠে থাকা, সে পাঁচ মিনিটের জন্যই হোক বা পুরো ম্যাচজুড়ে, সত্যিই অসাধারণ। শুধু ওর উপস্থিতিই আমাদের অনেক কিছু দেয়। তার ওপর ও প্রথম গোলটাও করেছে। অনুশীলন এবং ম্যাচ— দুই জায়গাতেই ও কতটা তীক্ষ্ণ ও মনোযোগী, তা স্পষ্ট দেখা যায়। বল নিয়ে হোক বা বল ছাড়া, ও দলের জন্য যা কিছু করে, তা আমাদের খুবই সাহায্য করছে।” ২০২৬-এর ২১ জুন লামিনে ইয়ামালের জীবনে চিরকাল এক বিশেষ দিন হয়ে থাকবে। কারণ, এই দিনেই তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের প্রথম গোলের স্বাদ পেয়েছেন। তবে এ হয়তো শুধু এক স্মরণীয় দিনই নয়, বরং এমন এক ফুটবলারের দীর্ঘ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে, যাঁর অসাধারণ প্রতিভা আগামী আরও কয়েকটি বিশ্বকাপও মাতাবে। তাঁকে ঘিরে স্পেন যেন নতুন এক আলোর উৎস খুঁজে পেয়েছে। আর এখন ‘লা রোহা’র একটাই আলোর রেখা— লামিনে ইয়ামাল। প্রতিটি স্প্যানিশ সমর্থকের এখন একটাই প্রার্থনা- এই আলোর ছটা যেন কখনও কমে না যায়।